
নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
নেত্রকোনার বারহাট্টায় রাজনৈতিক প্রভাবের দাপটে নির্মমভাবে খুন হওয়া আবু আব্বাছ ডিগ্রী কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী মোঃ আজিজুল হক (২০) হত্যা মামলা তুলে নিতে আসামিদের বর্বরোচিত তাণ্ডব শুরু হয়েছে। মামলা প্রত্যাহার না করায় এবার নিহতের চাচা ও প্রধান সাক্ষীকে শিকল দিয়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে জামিনে মুক্ত থাকা খুনিদের বিরুদ্ধে।
এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার।মামলার বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে রকি, রবিন ও ইনচান মিয়াসহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা কুপিয়ে হত্যা করে কলেজছাত্র আজিজুলকে। লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের পর নেত্রকোনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিট খুনিদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধনও করেছিল।
পরবর্তীতে আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও আইনি ফাঁকফোকরে জামিনে বের হয়ে আসে। জামিন পাওয়ার পর থেকেই রবিন-রকি সন্ত্রাসী বাহিনী মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নিহতের পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। রাত-বিরাতে নিহতের বাড়ির উঠানে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা তাদের নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে নিহত আজিজুলের চাচা ও মামলার অন্যতম সাক্ষী করিমুল হক (৫৮) বারহাট্টা সদরে এলে রবিন, রকি ও ইনচান মিয়াসহ তাদের বাহিনীর সদস্যরা তাকে পথরোধ করে প্রকাশ্য দিবালোকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে বু-কালিকা পুরাতন কোর্টের ভেতরে একটি জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত ঘরে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে লোহার শিকল দিয়ে হাত-পা বেঁধে লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্মমভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায় খুনিরা।
এ সময় তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন এবং নগদ ২০,৭০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোনের মাধ্যমে খবর পেয়ে বারহাট্টা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে করিমুল হককে রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে বারহাট্টা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এই ঘটনায় করিমুল হক বাদী হয়ে বারহাট্টা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী জানায়, আসামিরা জামিনে বের হওয়ার পর থেকে এলাকায় পুনরায় অসামাজিক কার্যক্রম, জুয়া ও মাদকের আস্তানা গড়ে তুলেছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নির্যাতনের ঘটনার পর থানায় নিয়ে আসার পরও মূল অভিযুক্ত রবিনকে লকআপের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে এবং বের হয়ে একটাকেও আস্ত রাখব না, সবকয়টাকে খুন করব” বলে প্রকাশ্য হুমকি দিতে শোনা গেছে। আসামিদের এমন দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া রূপের কারণে নিহত আজিজুলের পরিবার বর্তমানে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
সন্তানহারা বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতা মো: মঞ্জুরুল হক অত্যন্ত আক্ষেপ ও অশ্রুসজল চোখে বলেন, দেশ স্বাধীন করতে আমরা যুদ্ধ করেছি, আর আজ স্বাধীন দেশে সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে আমার সন্তানকে রক্ত দিতে হলো, আমার স্ত্রী সন্তানের শোকে বিগত ১০ বছর যাবত পাগলের মতো বিছানায় পড়ে আছে।
বিচারের আশায় ১০টি বছর ধরে আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরছি, কিন্তু আজ আমরাই আসামিদের ভয়ে ফেরারী।নিহত আজিজুলের পরিবার ও আসমা ইউনিয়নের সর্বস্তরের এলাকাবাসীর দাবি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অবিলম্বে এই রবিন ও রকি সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ফাঁসি নিশ্চিত করা হোক, যাতে অসহায় পরিবারটি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক নিরাপত্তা পায়।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply