
মোঃ সবুজ সরদার লোহাগড়া নড়াইল প্রতিনিধি
‘দেশের জন্য জীবন দেব, পিছু হটব না’ — মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে এমন অদম্য সাহসের প্রতীক হয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ।
সহযোদ্ধা গুরুতর আহত, চারদিকে শত্রুর গোলাবর্ষণ — তবুও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যাননি তিনি। আহত সহযোদ্ধাকে কাঁধে তুলে এক হাতে এলএমজি নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোরের গোয়ালহাটি ও ছুটিপুর এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করেন এই অকুতোভয় বীর।
আজ শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, তাঁর ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ অর্জন করেন।
শেষ মুহূর্তেও ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে নূর মোহাম্মদের সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া গুরুতর আহত হন। যুদ্ধক্ষেত্রে সহযোদ্ধাকে ফেলে যাওয়ার পরিবর্তে নূর মোহাম্মদ তাঁকে কাঁধে তুলে নেন। এক হাতে আহত সহযোদ্ধা, অন্য হাতে এলএমজি — এই অবস্থাতেই তিনি শত্রুর দিকে গুলি চালিয়ে যেতে থাকেন।
একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর মর্টারের আঘাতে তাঁর হাঁটু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীর ভেঙে পড়লেও মনোবল ভাঙেনি। আহত অবস্থাতেও তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতার জন্য রণাঙ্গনেই জীবন উৎসর্গ করেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ।
যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর সেই আত্মত্যাগ আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সাহস, দেশপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠার অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।
নড়াইলের মাটিতে জন্ম এক বীরের
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আমানত শেখ এবং মা জেন্নাতুন্নেছা — মতান্তরে জেন্নাতা খানম। শৈশবেই বাবা-মাকে হারান তিনি। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন।
১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) যোগ দেন নূর মোহাম্মদ। বর্তমানে এই বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই তিনি যশোর সেক্টরে বদলি হন এবং ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে শার্শা উপজেলার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধে অংশ নেন। তাঁর সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ তাঁকে পরিণত করে স্বাধীন বাংলাদেশের এক অমর বীরের প্রতীকে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply