
আব্বাস উদ্দিন:প্রতিনিধি(ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের পাশাপাশি নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি, ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং দীর্ঘদিন ধরে জেনারেটর অচল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা। এতে উপজেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ একমাত্র সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রত্যাশিত সেবা নিতে গিয়ে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রথম শ্রেণির ৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৬ জন। তবে তাদের মধ্যে পাঁচজন চিকিৎসক ডেপুটেশনে রয়েছেন। আরও দুইজন চিকিৎসককে পদায়ন করা হলেও তারা এখনো কর্মস্থলে যোগ দেননি। ফলে কাগজে চিকিৎসকের সংখ্যা ১৬ জন হলেও বাস্তবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন আরও কমসংখ্যক চিকিৎসক।
হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জারি, মেডিসিন, শিশু, চক্ষু ও ইএনটি বিভাগের পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো কনসালট্যান্ট চিকিৎসক নেই। ফলে জটিল রোগে আক্রান্তদের জেলা সদরসহ অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও সহায়ক জনবল কম হওয়ায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তৃতীয় শ্রেণির ৮০ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৯ জন কর্মরত থাকলেও সামগ্রিকভাবে জনবল সংকট কাটেনি।
সরাইল সদর এলাকার নাথপাড়ার বাসিন্দা মোঃ সোহেল মিয়া (৫০) ও দেওড়া গ্রামের রোকেয়া বেগম বলেন, “চিকিৎসক কম থাকায় আমরা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছি না।
নিউরো বিশেষজ্ঞ দেখাতে এসে জানতে পারলাম এখানে এমন কোনো চিকিৎসক নেই। তাই বাধ্য হয়ে জেলা শহরে যেতে হচ্ছে।”আর এক রোগী এগিয়ে এসে বলে আমাদের সাধারণ রোগীর সাথে ডায়রিয়া রোগী পাশাপাশি থাকতে হচ্ছে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখাতে আসা একজন বলেন, “আমার মেয়ে অসুস্থ। হাসপাতালে এসে জানতে পারলাম এখানে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ নেই। সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পাওয়া যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়েও রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বহিরাগত ব্যক্তিকে বসিয়ে ওষুধ বিতরণ, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে টিকিট বিক্রি এবং হাসপাতালে ওষুধ থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাসপাতালের ওষুধ বিতরণকেন্দ্রে সরকারি কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে বসে কাজ করতে দেখা গিয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি জানেন বলে জানান। তার দাবি, ওই ব্যক্তি শিক্ষিত এবং কাজটি করায় আপাতত কোনো সমস্যা নেই।
তবে সরকারি কর্মকর্তার পরিবর্তে বহিরাগত ব্যক্তিকে দিয়ে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমোদন আছে কি না, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
বহির্বিভাগের টিকিট নিয়েও রোগীদের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন রোগী জানান, ৩ টাকা নির্ধারিত মূল্যের টিকিটের জন্য তাদের কাছ থেকে ৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এ অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ওষুধ সরবরাহ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোগীরা। তাদের অভিযোগ, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে একাধিক ওষুধ লেখা থাকলেও হাসপাতালের কাউন্টার থেকে সব ওষুধ দেওয়া হয় না। অনেক সময় এক-দুই ধরনের কমদামী ওষুধ দিয়ে বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়।
এক রোগী বলেন, “আমরা দরিদ্র মানুষ। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই বলেই সরকারি হাসপাতালে আসি। এখানে এসে যদি প্রেসক্রিপশনের ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হয়, তাহলে সরকারি হাসপাতালের সুবিধা কী?” উক্ত রোগী আক্ষেপ করে বলেন ৬০টাকা গাড়িভাড়া দিয়ে এসে ১০টাকা মূল্যের এন্টারসিড ট্যাবলেট পেয়েছি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ মজুত রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে গ্যাসের ওষুধ পর্যাপ্ত আছে। তবে প্রেসক্রিপশনে থাকা অন্যান্য ওষুধ রোগীদের কেন দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, হাসপাতালের ওষুধের মজুত, বিতরণ ও রোগীদের সরবরাহের হিসাব স্বচ্ছভাবে যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে টিকিটের মূল্য এবং সরকারি কাজে বহিরাগত ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ডা. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, “প্রতিদিন হাসপাতালে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সীমিত জনবল দিয়েই আমরা আন্তরিকভাবে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় চাপ সামলাতে কষ্ট হয়।”
তিনি জানান, শূন্য পদে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। দুইজন চিকিৎসককে পদায়ন করা হলেও তারা এখনো কাজে যোগ দেননি। দ্রুত জনবল নিয়োগ হলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৭৫ সালে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১২ সালে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকলেও হসপিটালের আধুনিক অপারেশন থিয়েটার বেশীরভাগই বন্ধ থাকে, বছরে লোকদেখানো কয়েকটি সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। চিকিৎসক-জনবল সংকট এবং ব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগের কারণে এসব সুবিধার পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না উপজেলাবাসী।
এদিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের অন্ধকারে থাকতে হয়। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জেনারেটর থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় দুই বছর ধরে জেনারেটরটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে জরুরি সেবা ও রোগীদের চলাচলে দুর্ভোগ বাড়ে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রতিদিন শত শত মানুষ চিকিৎসার জন্য আসা এই হাসপাতালে যদি প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবলই না থাকে, তাহলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হবে কীভাবে?
তাদের দাবি, দ্রুত চিকিৎসক ও জনবলের শূন্য পদ পূরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন, ওষুধের মজুত ও বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, টিকিটের মূল্য নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত, অকেজো জেনারেটর সচল এবং হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি এই হাসপাতাল যেন কেবল ভবন ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সহজলভ্য, স্বচ্ছ এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply