
মোহাম্মদ লিয়াকত হোসেন জনী
প্রভাষক অর্থনীতি বিভাগ ও বিভাীয় প্রধান, মধুপুর ,টাঙ্গাইল
সভ্যতার সূচনা থেকে বর্তমান আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ পর্যন্ত মানবজাতির অগ্রযাত্রার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে গেছেন যিনি, তিনি হলেন শিক্ষক। শিক্ষক কেবল কতগুলো তথ্য বা পাঠ্যবইয়ের পাতার জ্ঞান বিতরণকারী নন; বরং তিনি এক কারিগর, যিনি মানুষের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করেন এবং তাকে সত্য, সুন্দর ও আলোর পথে পরিচালিত করেন।
শিক্ষক আসলে কে?
সাধারণ অর্থে যিনি শিক্ষা দান করেন তিনিই শিক্ষক। তবে ব্যাপক অর্থে, শিক্ষক হলেন সমাজ রূপান্তরের এক নিভৃত কারিগর। দার্শনিক উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড শিক্ষকদের সম্পর্কে অত্যন্ত সুন্দর একটি মন্তব্য করেছিলেন: “সাধারণ শিক্ষক বলেন, ভালো শিক্ষক বুঝিয়ে দেন, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক করে দেখান, আর মহান শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন।” যে ব্যক্তি শিক্ষার্থীর মনে জানার কৌতূহল তৈরি করেন, নীতিবোধ ও নৈতিকতার বীজ বপন করেন এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথ দেখান, তিনিই প্রকৃত শিক্ষক। শিক্ষক সমাজ গঠনের রূপকার এবং জাতির আলোকবর্তিকা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পটভূমি ও উদযাপন
শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সম্মান জানাতে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’।
কখন ও কোথায় শুরু: প্রথম বিশ্বব্যাপী শিক্ষক দিবস উদযাপনের সূচনা হয় ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর। ইউনেস্কো ( ইউনেস্কো ) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ( আই এল ও ) যৌথ উদ্যোগে শিক্ষকদের মর্যাদা সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক সুপারিশ গৃহীত হওয়ার স্মরণে এই দিনটি নির্ধারিত হয়।
প্রথম বিশ্বের দেশসমূহে: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। অনেক দেশে স্থানীয়ভাবে তাদের নিজস্ব শিক্ষক দিবস থাকলেও, ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত শতাধিক দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত হয়। এ দিনে সেমিনার, শিক্ষক সম্মাননা প্রদান এবং শিক্ষকদের পেশাগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে নানা আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য:
শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও সুদূর প্রসারী: সমাজে শিক্ষকদের অবদান এবং তাদের ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ এই দিনটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সচেতনতা শিক্ষকদের নায্য অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে।একজন শিক্ষক তখনই তার সেরাটা দিতে পারেন যখন তিনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে নিরাপদ থাকেন। এই দিবসটি শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়:
আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শিক্ষার মান বাড়লেও শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদায় অনেক সময় ভাটা পড়ছে। অথচ শিক্ষক ভালো না থাকলে একটি জাতি কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো শিক্ষকদের সমাজের সর্বোচ্চ সম্মান ও বেতন দিয়ে থাকে, কারণ তারা জানে শিক্ষক গড়ার অর্থ একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা।
আমাদের দেশেও শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক দিবসে আমাদের কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শিক্ষকদের অধিকার রক্ষায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার পণ করতে হবে। আসুন, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই কেবল একটি দিনে নয়, বছরের প্রতিটি মুহূর্তে। কারণ শিক্ষকের আলোতেই উদ্ভাসিত হোক আমাদের আগামী দিনের সুন্দর পৃথিবী।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply