
শেখ সাদী সুমন জেলা প্রতি নিধী ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে অনিয়ম, দুর্নীতি, চরম অব্যবস্থাপনা ও রোগী হয়রানির একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের সার্বিক চিকিৎসাসেবা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী রোগী, স্বজন ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এসব অভিযোগের তীর হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালীর দিকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব দুর্নীতি তদন্ত করে তার দ্রুত অপসারণ এবং একজন দক্ষ ও মানবিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
চিকিৎসাসেবায় চরম অব্যবস্থাপনা ও দালালচক্র:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরসহ সরাইল, আশুগঞ্জ, কসবা, নবীনগর, আখাউড়া ও নাসিরনগর উপজেলার হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল এই সরকারি হাসপাতালটি। অথচ চিকিৎসা নিতে এসে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের জোরপূর্বক কিংবা বিভ্রান্ত করে বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠায় সক্রিয় দালালচক্র। হাসপাতালের ভেতর ও ওয়ার্ডের সামনে অবাধ বিচরণ রয়েছে এই চক্রের।
ল্যাবরেটরিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সরঞ্জামের কৃত্রিম সংকট:
হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে রক্তের নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পর্যাপ্ত ‘ডিসপোজেবল কাপ’ সরবরাহ না করে একই কাপ বারবার ধুয়ে ব্যবহারের মতো মারাত্মক ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে, যা পরীক্ষার নির্ভুলতা ও রোগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এছাড়া হাসপাতালের মূল্যবান এক্স-রে ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট বা বরাদ্দ সংকট দেখিয়ে রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হচ্ছে।
অর্থের বিনিময়ে উপস্থিতি ও ভুয়া ভাউচারের অভিযোগ:
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, কিছু চিকিৎসক নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকেন না এবং ডিউটি শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। হাজিরা রেজিস্টার ও ছুটির ব্যবস্থাপনা অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে। পাশাপাশি হাসপাতালের বিভিন্ন কেনাকাটা, টেন্ডার, ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত কাজ, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড এবং অভ্যন্তরীন দোকান বরাদ্দ থেকে অবৈধ অর্থ লেনদেন ও ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি তহবিল তছরুপের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও বিতর্কিত অতীত:
ডা. রতন কুমার ঢালী পূর্বে ঝালকাঠির সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২১ সালে সুগন্ধা নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ওএসডি (OSD) হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, চলতি বছরেই তিনি সরকারি অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন কর্মস্থলের বাইরে ছিলেন এবং প্রায় ৮০ দিনেরও বেশি সময় অবৈধ ছুটি ভোগ করেছেন।
তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার দাবি:
একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালের এই নাজুক পরিস্থিতিতে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন সাধারণ রোগীরা। স্থানীয়দের দাবি—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয় অডিট, ভাউচার যাচাই, বায়োমেট্রিক হাজিরা পরীক্ষা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। দুর্নীতি প্রমাণের ভিত্তিতে অবিলম্বে ডা. রতন কুমার ঢালীকে অপসারণ করে হাসপাতালে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply