
এনামুল হক নাসিম,চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে অটোরিকশাচালক রুমন আলী (২৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, পূর্বপরিচিত শাওন (ছদ্মনাম) অল্প দামে শক্তিশালী লিথিয়াম ব্যাটারি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রুমনকে নির্জন পুটিমারি বিলের আখক্ষেতে নিয়ে যায়। সেখানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের তদন্তে জানা গেছে।হত্যার পর রুমনের অটোরিকশা বিক্রির চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশের অনুসন্ধানে অটোরিকশাটি উদ্ধার এবং সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের পর বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় শাওনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুটিমারি বিলের একটি আখক্ষেত থেকে রুমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২১ আগস্ট ভোর সাড়ে ৫টার দিকে প্রতিদিনের মতো অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন রুমন আলী। তিনি শিবগঞ্জ পৌর এলাকার কানসাট এলাকায় পৌঁছানোর পর অটোরিকশাসহ নিখোঁজ হন। সকাল গড়িয়ে দুপুর, বিকেল ও রাত হলেও রুমন বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। পরে তার নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তদন্তে জানা যায়, রুমনের পূর্বপরিচিত শাওন তাকে একটি শক্তিশালী লিথিয়াম ব্যাটারি অল্প দামে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ওই ব্যাটারি একবার চার্জে প্রায় ২০০ কিলোমিটার চলবে বলে তাকে প্রলোভিত করা হয়। প্রস্তাবে রাজি হয়ে রুমন শাওনকে সঙ্গে নিয়ে শিবগঞ্জ পৌরসভার পুটিমারি বিলের দিকে অটোরিকশায় রওনা হন। বিলের বায়োগ্যাস প্লান্টের অদূরে একটি খেজুরগাছের কাছে অটোরিকশা থামানো হয়। পরে দুজন পাটক্ষেত ও আখক্ষেতের ভেতর দিয়ে আরও নির্জন স্থানে যায়।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাটারি লুকিয়ে রাখা হয়েছে—এমন কথা বলে রুমনের চোখ বাঁধা হয়। এরপর আখক্ষেতের গভীরে নিয়ে গিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্তে জানা যায়, রহমান তার পরিচিত শফিকুলের (ছদ্মনাম) কাছে অটোরিকশাটি ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এর মধ্যে ৭০ হাজার টাকা শাওনকে দেওয়া হয় এবং অবশিষ্ট টাকা নিজের কাছে রাখা হয় বলে পুলিশের তদন্তে জানা গেছে। রুমনের নিখোঁজের ঘটনায় তদন্তে নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ। তার সর্বশেষ অবস্থান, চলাফেরা, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, অটোরিকশার গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা শাওন ও রহমানের ওপর সন্দেহ করেন।পরবর্তীতে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে শফিকুলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রুমনের অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়। অটোরিকশা উদ্ধারের পর ঘটনাটি নিছক নিখোঁজের ঘটনা নয়—এমন ধারণা আরও জোরালো হয় তদন্তকারীদের মধ্যে। তিনজনকে আদালতে সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করলে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শাওনের কাছ থেকে রুমনের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৬ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুটিমারি বিলে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ।পুলিশের একটি দল শাওনকে সঙ্গে নিয়ে পুটিমারি বিলের নির্জন আখক্ষেতে যায়। পরে তার দেখানো স্থানে তল্লাশি চালিয়ে রুমন আলীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন ধরে পড়ে থাকায় মরদেহের স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাসুয়াসহ প্রয়োজনীয় আলামত জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে শাওন বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। রুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর তার পরিবারের সদস্যদের কাছে বিষয়টি জানানো হয়। স্ত্রী নাজমা সুলতানার কাছে রুমনের ব্যবহৃত জুতা, প্যান্ট ও পকেটে থাকা মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য জিনিসপত্র দেখানো হলে তিনি সেগুলো দেখে তার স্বামীকে শনাক্ত করেন। ২১ আগস্ট সকালে যে মানুষটি জীবিকার সন্ধানে অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, কয়েক দিন পর তার পরিবারকে তার নিথর দেহের সন্ধান পেতে হলো।রুমন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ। নিখোঁজ অটোরিকশা উদ্ধার, সন্দেহভাজনদের আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, রিমান্ড এবং আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়। পুলিশের তদন্তে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অটোরিকশাটি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে রুমনকে ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রুমনের পরিবারের সদস্যরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply