
এনামুল হক নাসিম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি :
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর জীবন ও সাহিত্য আজও মানুষকে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখায় এবং সংগ্রামের প্রেরণা জোগায় বলে মন্তব্য করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. বিপ্লব কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, নজরুলের জীবন ও সাহিত্য কেবল একটি যুগের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং মানবমুক্তি, সাম্য, প্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দলিল। তাঁর রচনা আজও মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে এবং মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রফেসর ড. বিপ্লব কুমার মজুমদার বলেন, নজরুলের প্রথম বড় সাফল্য ছিল বাঙালি পাঠককে চমকে দেওয়া। তাঁর কবিতা সরাসরি মানুষের আবেগে নাড়া দিত। গতিময়, সুরেলা ও মুক্ত প্রবাহের ভাষার কারণে তাঁর কবিতা পাঠের পাশাপাশি আবৃত্তি ও সংগীতে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। ‘বিদ্রোহী’, ‘কাণ্ডারীর গান’, ‘সাম্যবাদী’, ‘কুলি-মজুর’, ‘দারিদ্র্য’ ও ‘ছাত্রের গান’-এর মতো রচনায় সাধারণ মানুষ নিজেদের বেদনা, ক্ষোভ ও স্বপ্নের প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছিল। তিনি আরও বলেন, নজরুল ছিলেন জনমানুষের কণ্ঠস্বর। ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলে বন্দি একটি জাতি যখন সংগ্রামের ভাষা খুঁজছিল, তখন নজরুল তাঁর কবিতায় সেই তেজ, সাহস ও দ্রোহের ভাষা তুলে ধরেন। তাঁর কবিতার তরবারির ঝনঝনানি, শঙ্খধ্বনি ও রণভেরী স্বাধীনতার
আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত করেছিল মানুষকে। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের প্রতীক ও স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা। সংগীতস্রষ্টা হিসেবেও নজরুলের অবদান অনন্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, নজরুলগীতি বাংলা সংগীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইসলামি সংগীত, শ্যামাসংগীত, দেশাত্মবোধক গান, প্রেমের গান, কীর্তনধর্মী সংগীত ও রাগাশ্রিত গানের মাধ্যমে তিনি বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর গান শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষিত সমাজ থেকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে। অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. বিপ্লব কুমার মজুমদার বলেন, ঐতিহাসিক বিচারে নজরুল ছিলেন যুগের সন্তান এবং যুগান্তকারী কণ্ঠস্বর। তিনি তাঁর সময়ের চাহিদাকে শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। পরাধীন জাতির মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করা, সংগ্রামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করা এবং আশার আলো জ্বালিয়ে রাখাই ছিল তাঁর ঐতিহাসিক কৃতিত্ব। তিনি আরও বলেন, নজরুলের জনপ্রিয়তার মূল কারণ ছিল মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের দুঃখকে নিজের দুঃখ হিসেবে অনুভব করতেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন দ্রোহের আগুন রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রেম, মানবতা, সাম্য ও গভীর মানবিকতার সুর। বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতে সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি, নারী-পুরুষের সমতা, মানুষের স্বাধীন সত্তা এবং মানবমুক্তির মতো মূল্যবোধ সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এসব আদর্শের চর্চা একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বাংলা সাহিত্যের একটি অধ্যায় নন; তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম, প্রেম ও সংস্কৃতির চিরন্তন প্রতীক। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের চর্চা যত বিস্তৃত হবে, ততই মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণের পথ সুদৃঢ় হবে।”
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply