
শফিকুল আলম সজীব দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।
তথ্যপ্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর পৌরসভার ‘দুর্গাপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থান’পরিচালনা কমিটি। ঐতিহ্যবাহী এই কবরস্থানটি সুশৃঙ্খল ডিজিটাল অটোমেশন সিস্টেমের আওতায় আসার পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের স্বেচ্ছাশ্রম ও পরিচালনা কমিটির দক্ষতায় লাভ করেছে এক দৃষ্টিনন্দন ও স্বনির্ভর রূপ। সম্প্রতি দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কবরস্থান ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালুর গৌরব অর্জন করেছে।
ডিজিটালাইজেশনের অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট (https://www.durgapur.koborsthan.com) ও মোবাইল অ্যাপ। এই ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটির সফল বাস্তবায়নে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে JK Technology Bangladesh পুরো কবরস্থান প্রাঙ্গণকে নির্দিষ্ট ব্লক, প্লট, লাইন ও সুনির্দিষ্ট কবর নম্বরে বিন্যস্ত করায় ঘরে বসেই মরহুমের সঠিক কবরের অবস্থান ও তথ্য খুঁজে পাচ্ছেন স্বজনেরা। বিশেষ করে প্রবাসে অবস্থানরত ব্যক্তিরা অনলাইনেই স্বজনের কবরের অবস্থান দেখতে পারছেন এবং সরাসরি অনুদান পাঠাতে পারছেন, যা তাঁদের মাঝে এনে দিয়েছে এক পরম মানসিক স্বস্তি।
দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকা এই প্রতিষ্ঠানটির মূল পরিবর্তনের সূচনা ঘটে গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে দায়িত্ব নেওয়া ৩১ সদস্যবিশিষ্ট নতুন পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় তরুণদের সামাজিক সংগঠন ‘আল খিদমাহ স্বেচ্ছাসেবক যুব ফাউন্ডেশন’-এর যৌথ উদ্যোগে। তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় কবরস্থানে নির্মিত হয়েছে নতুন সীমানা প্রাচীর, সুদৃশ্য হাটার পথ, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন অজুখানা, অফিস কক্ষ এবং দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জায়গা। কবরস্থানের সৌন্দর্য বাড়াতে পথের দুই পাশে রোপণ করা হয়েছে খেজুর গাছ ও রকমারি ফুল গাছ।
‘আল খিদমাহ স্বেচ্ছাসেবক যুব ফাউন্ডেশন’-এর তরুণ সদস্যরা নিয়মিত কবরস্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সরাসরি কবর খনন, মরদেহের গোসল করানো এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দাফন-কাফনের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করছেন।
এখানে ইসলামী শরীয়াহ নির্দেশনাসমূহ কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। শরীয়াহ অনুযায়ী কবর পাকা করা বা মাজার নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দুই বছর পর নিয়ম মেনে সাধারণ কবর পুনরায় ব্যবহারের নীতি অনুসরণ করা হয়। শৃঙ্খলা মেনে সিরিয়াল অনুযায়ী কবর দেওয়ার প্রচলন চালু করা হয়।পরিচালনা ও আর্থিক ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি মাসের আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব কবরস্থানের নোটিশ বোর্ডের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইটেও নিয়মিত প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হচ্ছে।
এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন ও ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের স্বজনদের সন্তুষ্টির কথা জানা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল আলম বলেন, “আগে এই কবরস্থানের পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক ছিল, ঝোপঝাড় আর নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষ সহজে যেতে চাইত না। কিন্তু বর্তমান কমিটি ও আল খিদমাহ ফাউন্ডেশনের তরুণেরা দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি এখন একটি মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করায় সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের অনেক বড় উপকার হয়েছে।”
সৌদি আরব প্রবাসী মো. আব্দুল কাদির সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “আমি প্রবাসে থেকেও মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আমার মরহুম ভাইয়ের কবরের সুনির্দিষ্ট অবস্থান দেখতে পেরেছি। এমনকি ঘরে বসেই কবরস্থানের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারছি। প্রযুক্তির এমন চমৎকার ব্যবহার আমাদের মতো প্রবাসীদের মানসিক শান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।”
কবরস্থান কমিটির উপদেষ্টা হাজী কাসেম মড়ল বলেন, “JK Technology Bangladesh-এর প্রতিষ্ঠাতা এ.টি.এম. মোসলে উদ্দিনের তৈরি করা এই ডিজিটাল কবরস্থান ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং আমাদের এলাকার তরুণদের নিঃস্বার্থ সেবামূলক কর্মকাণ্ড দুর্গাপুরকে সারা দেশের কাছে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেছে। সঠিক নেতৃত্ব এবং সদিচ্ছা থাকলে কীভাবে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে বদলে দেওয়া যায়, এটি তারই এক উজ্জ্বল নিদর্শন।”
স্থানীয়রা বলেন সঠিক নেতৃত্ব, তরুণদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার থাকলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে একটি স্বনির্ভর ও মানবিক সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব।
Leave a Reply