
মোঃমামুন নীলফামারী প্রতিনিধি
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থেকে মুক্তারের দোকান হয়ে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গাইড বাঁধ পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা যেন সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের নীরব সাক্ষী। এক কিলোমিটার পাকা সড়ক সংস্কারের অভাবে ভেঙ্গেচুরে অসংখ্য খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। অপর এক কিলোমিটার সড়ক এখনো কাঁচা। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো সড়কজুড়ে কাদা, পানি ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। ফলে শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়া, কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানো কিংবা শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, সব ক্ষেত্রেই নিত্যদিনের দুর্ভোগ যেন এ অঞ্চলের মানুষের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গয়াবাড়ী ইউনিয়নের শুটিবাড়ি বাজার থেকে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার পাকা সড়ক চলাচলের উপযোগী রয়েছে। তবে ইউপি ভবন থেকে মুক্তারের দোকান পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পাকা সড়কের কার্পেটিং উঠে গিয়ে অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে মুক্তারের দোকান থেকে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গাইড বাঁধ পর্যন্ত আরও এক কিলোমিটার কাঁচা সড়ক বর্ষাকালে কর্দমাক্ত হয়ে কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমানে পুরো সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার হলেও শেষের দুই কিলোমিটার অংশই সীমান্তবর্তী মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ।রাস্তার দুই ধার ও আশপাশের এলাকাসহ তিস্তা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে কয়েক হাজার পরিবারের বসবাস। এসব মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় যাতায়াতের প্রধান ভরসা এই সড়ক। বিকল্প কোনো কার্যকর সড়ক না থাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ পথ ব্যবহার করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০৩ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিনের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), ডিমলার মাধ্যমে শুটিবাড়ি বাজার থেকে মুক্তারের দোকান পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণ করা হয়। পরে শুটিবাড়ি বাজার থেকে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়ক পুনঃসংস্কার করা হলেও ইউপি ভবন থেকে মুক্তারের দোকান পর্যন্ত এক কিলোমিটার অংশ আর সংস্কার করা হয়নি। অপরদিকে মুক্তারের দোকান থেকে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গাইড বাঁধ পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়ক আজও কাঁচাই রয়ে গেছে।
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তিস্তা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় যাতায়াতের অন্যতম ভরসা এই সড়ক। তিস্তা নদীর চরাঞ্চল এ উপজেলার অন্যতম কৃষি উৎপাদন এলাকা। প্রতিবছর এখানে বিপুল পরিমাণ গম, ভুট্টা, বাদাম, ধান, মরিচ, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি উৎপাদিত হয়। সপ্তাহে মঙ্গলবার ও শুক্রবার শুটিবাড়ি হাটে এসব কৃষিপণ্য বিক্রি করতে আসেন কৃষকরা। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়কের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক সময় যানবাহন কাদায় আটকে পড়ায় কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
সড়কটির শেষ প্রান্তে তিস্তা নদীসংলগ্ন বার্নির ঘাট সীমান্ত এলাকায় বিজিবির একটি বিওপি ক্যাম্প রয়েছে। সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ, বিজিবি সদস্য এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদেরও নিয়মিত এই সড়ক ব্যবহার করতে হয়। এছাড়া সড়কটির দুই পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও মসজিদ থাকায় প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে গিয়েও অনেক সময় ভোগান্তির শিকার হতে হয় স্বজনদের।
তিস্তা বাজার ও বার্নির ঘাট সীমান্ত এলাকার কৃষক জয়নাল আবেদীন, ফারুক হোসেন, বেলায়েত হোসেন ও গনি মিয়া বলেন, “বছরের পর বছর এই ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে চলাচল করছি। কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। লাভের বদলে লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
তিস্তা বাজারের ইজিবাইক চালক খলিলুর রহমান বলেন, “খানাখন্দ আর কাদার কারণে প্রতিনিয়ত গাড়ির মোটর, কন্ট্রোলারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। আয়ের চেয়ে ব্যয়ই বেশি হয়ে যাচ্ছে।”
স্থানীয় দোকানদার নজরুল ইসলাম ও শাহিন মিয়া বলেন, “সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক ক্রেতা দুর্ভোগের ভয়ে বাজারে আসতে চান না।”
অটোভ্যান চালক হাসেম আলী সরকার বলেন, “রাস্তাটি ভালো থাকলে সময়, শ্রম ও খরচ সবই কমে যেত। এখন প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।”
এলাকাবাসীর দাবি, টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থেকে মুক্তারের দোকান পর্যন্ত এক কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত পাকা সড়কের দ্রুত সংস্কার এবং মুক্তারের দোকান থেকে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গাইড বাঁধ পর্যন্ত এক কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণ করা হলে সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান বলেন, “সড়কটি উন্নয়নের বিষয়টি আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, “স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply