
মোহাম্মদ রাসেল: (ইটনা-মিটামইন-অষ্টগ্রাম) কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ডাকাতদের উদ্দেশে ‘শেষ হুঁশিয়ারি’ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সন্ধ্যার পর হাওরে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১১ জুলাই) এক ভিডিও বার্তায় এমপি ফজলুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইনের হাওর এলাকায় কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা তাকে বিক্ষুব্ধ ও বিস্মিত করেছে। তিনি এলাকার মানুষকে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসন বা প্রশাসনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে আপনারা নিজেরা সংগঠিত হোন। হাওর আজ পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে মানুষের যাতায়াত যাতে কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
সন্ধ্যার পর হাওরে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এমপি বলেন, প্রশাসন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের পর থেকে হাওর এলাকায় নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত এটি। আমার কাছে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। এই এলাকায় সারা জীবন গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজনেই নৌকা চলেছে। তাই এই সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহার করা উচিত।
ডাকাতদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “যারা ডাকাতি করছে তাদের তালিকা আমাদের কাছে আছে। তোমরা যদি ডাকাতি থেকে বিরত না হও, তাহলে হাওর অঞ্চলে তোমাদের কোনো জায়গা হবে না। তোমাদের স্থান হবে জেলখানায়। এটা আমার শেষ ওয়ার্নিং।
তিনি আরও বলেন, সংসদ অধিবেশন শেষে তিনি নিজে এলাকায় এসে অবস্থান করবেন এবং জনসাধারণকে সংগঠিত করবেন। এরপর ডাকাতদের তালিকা ধরে তাদের আস্তানায় গিয়ে তাদের উৎখাতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে যারা অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তাদের জন্য আত্মসমর্পণের আহ্বানও জানান তিনি। এমপি বলেন, তোমরা যদি ভালো হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করো, প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করো এবং তওবা করো, তাহলে আমরা তোমাদের ব্যাপারে বিশেষ বিবেচনা করব।
তিনি দাবি করেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে দেশবিরোধী শক্তিও এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করতে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
হাওরাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন—এই তিন থানার জন্য তিনটি দ্রুতগামী স্পিডবোট বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান এমপি। তিনি বলেন, “ডাকাতরা দ্রুতগামী নৌকা ব্যবহার করে। তাই তিন থানার পুলিশের জন্য দ্রুতগামী স্পিডবোট প্রয়োজন। শুধু দায়িত্ব দিলেই হবে না, পুলিশকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও দিতে হবে।
পর্যটকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হাওরে নিশ্চিন্তে আসুন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করুন। আপনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের।
এর আগে শনিবার বিকেলে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হাওরাঞ্চলে ভ্রমণকারী পর্যটক ও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি এড়াতে বিশেষ সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
এ নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিদিন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের পর হাওরাঞ্চলে যাতায়াত, অবস্থান এবং নৌযান চলাচল থেকে বিরত থাকার জন্য সর্বসাধারণ ও পর্যটকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে একের পর এক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ৭ জুন রাতে মিঠামইন ও করিমগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ৪০ জন পর্যটককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একদল ডাকাত। পরে পর্যটকদের মারধর করে মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয়।
এর এক মাস পর, ৭ জুলাই রাত ১০টার দিকে করিমগঞ্জের বালিখোলা ঘাট থেকে মিঠামইনের ঘাগড়াগামী একটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সুতারপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও সুইচগেট এলাকায় ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ বহনকারী ওই ট্রলারে হামলা চালিয়ে ডাকাতরা তিনটি মোবাইল ফোন, একটি সোলার ব্যাটারি ও নগদ অর্থ লুট করে নেয়। মানবিক এই ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সবশেষে ৮ জুলাই রাত সাড়ে ৭টার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেয়ারপুর ব্রিজসংলগ্ন বগাডুবি খাল এলাকায় যাত্রীবাহী একটি ট্রলারে দেশীয় অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে ডাকাতি করা হয়। এ সময় ডাকাতরা ট্রলারে থাকা হাঁড়ি-পাতিল, ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, দুটি মোবাইল ফোন এবং নগদ ৭৪ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply