
মো: রেজাউল ইসলাম শাফি, কুলাউড়া প্রতিনিধিঃ
শিশুদের ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে বাসাবাড়ি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক নির্যাতনের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। তথাকথিত ‘মানুষ করার’ নামে এই পদ্ধতি শিশুদের উন্নয়ন তো করেই না, বরং তাদের মানসিক, সামাজিক ও জৈবিক ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাঈদ এনাম শিশুদের বিকাশে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কুফল এবং এর বৈজ্ঞানিক সমাধান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। তার মতে, আধুনিক বিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শারীরিক শাস্তিকে শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক শাস্তি শিশুদের মধ্যে ভয়, লজ্জা, রাগ ও অনিরাপত্তা তৈরি করে। শুধু শারীরিক প্রহার নয়, কটুকথা, তীর্যক মন্তব্য, নিন্দাসূচক উপনাম বা অন্যদের সঙ্গে তুলনা করাও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ৬৯টি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মারধর করলে শিশুর আচরণ ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরও আচরণগত সমস্যা বৃদ্ধি পায়। বাস্তবে মারধর শিশুর আচরণকে ‘ঠিক’ করার বদলে উল্টো ফল বয়ে আনে।
ডা. মো. সাঈদ এনামের মতে, শৈশবের নির্যাতনের স্মৃতি পরিণত বয়সে নানা জটিল মানসিক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৭টি রোগ হলো— পিটিএসডি (Post-Traumatic Stress Disorder) বা ট্রমার স্মৃতি বারবার ফিরে আসা ও অতিরিক্ত ভয়; মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার বা দীর্ঘস্থায়ী দুঃখবোধ ও হতাশা; জেনারেলাইজড এনজাইটি ডিসঅর্ডার বা অকারণ দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা; বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বা আবেগের অস্থিরতা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন; মাদকাসক্তি (Substance Use Disorder); ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডার বা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD) বা একই চিন্তা ও বাধ্যতামূলক কাজ বারবার করার প্রবণতা।
শিশুকে মারধরের বদলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ‘পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট’ ও ‘নেগেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট’ পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর বলে ডা. সাঈদ এনাম উল্লেখ করেন। পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট বা ইতিবাচক প্রণোদনা হলো— কোনো কাঙ্ক্ষিত আচরণের পর শিশুকে একটি সুখকর বা পছন্দের বিষয় ‘দেওয়া’, যাতে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে। যেমন: শিশু স্কুলে ভালো ফল করলে তাকে একটি গল্পের বই উপহার দেওয়া। অন্যদিকে, নেগেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট বা নেতিবাচক প্রণোদনা হলো— কোনো কাঙ্ক্ষিত আচরণের পর শিশুর জন্য একটি অপ্রীতিকর বা বিরক্তিকর বিষয় ‘সরিয়ে নেওয়া’, যাতে সেই আচরণটি আরও শক্তিশালী হয়। যেমন: একটি শিশু পড়াশোনা না করলে তাকে প্রতিদিন অতিরিক্ত অনুশীলনী দেওয়া হতো; কিন্তু সে নিয়মিত পড়া শুরু করায় সেই অতিরিক্ত কাজ বন্ধ করে দেওয়া হলো। এতে তার পড়ার অভ্যাসটি আরও দৃঢ় হয়। শৈশবের কোমল মনে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করাই হওয়া উচিত একজন আদর্শ অভিভাবক ও শিক্ষকের মূল দায়িত্ব। শারীরিক নির্যাতন করে কখনো সুঅভ্যাস গড়ে তোলা যায় না, বরং তা শিশুর সুস্থ মানুষ হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply