
জাকিয়া বেগম বিশেষ প্রতিনিধি
নজরুল ইসলাম কাজল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারে মানুষের কণ্ঠস্বর আজ আরও শক্তিশালী, আরও বিস্তৃত। কিন্তু এই শক্তির আড়ালেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন সংকট—বট ও ফেক আইডির মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মহামারি। যা এখন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই; শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী—সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষই এর শিকার।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিথ্যা তথ্য ছড়াতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড, অথচ সেই মিথ্যা খণ্ডন করতে লাগে দিন, কখনো মাস, কখনো বা পুরো জীবন। একটি ভুয়া পোস্ট, একটি বিকৃত ছবি কিংবা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও—কারো সম্মান, পেশা এমনকি মানসিক স্থিতি পর্যন্ত ধ্বংস করে দিতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল স্রোত থেকে মুক্তির পথ কোথায়?
প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে—এই সমস্যা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটও। বট বা স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট দিয়ে সংগঠিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, আর ফেক আইডির আড়ালে লুকিয়ে থেকে মানুষ দায়মুক্তির সুযোগ নিচ্ছে। ফলে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত সচেতনতা। আমরা অনেকেই না জেনেই ভুয়া তথ্যের বাহক হয়ে উঠি। কোনো কিছু দেখেই শেয়ার করা, যাচাই না করে মন্তব্য করা—এসব অভ্যাস আমাদেরই ক্ষতির কারণ। তাই তথ্য যাচাই করা, নির্ভরযোগ্য উৎস খোঁজা এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট এড়িয়ে চলা এখন নাগরিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতা সময়ের দাবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস-আদালত পর্যন্ত—সব জায়গায় তথ্য যাচাই, অনলাইন আচরণবিধি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ জরুরি। একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তা যদি নিজেই ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে না পারেন, তবে তিনি অন্যদের কীভাবে সচেতন করবেন?
তৃতীয়ত, আইন ও তার প্রয়োগ হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর। ভুয়া তথ্য ছড়ানো একটি অপরাধ—এতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে সেই আইনের প্রয়োগ যেন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নইলে আইনের অপব্যবহার আরেকটি সমস্যার জন্ম দেবে।
চতুর্থত, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে শুধু ব্যবসায়িক লাভ নয়, সামাজিক দায়ও নিতে হবে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণ, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং কনটেন্ট মনিটরিং আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। আমরা যদি নিজেরাই সচেতন হই, গুজবকে ‘না’ বলি এবং অন্যকেও সতর্ক করি—তাহলেই এই প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। মনে রাখতে হবে, একটি ভুয়া তথ্য শেয়ার করার অর্থ হলো—অন্যের ক্ষতিতে নিজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
ডিজিটাল যুগে তথ্যই শক্তি, কিন্তু সেই তথ্য যদি মিথ্যার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তাই বট ও ফেক আইডির এই অন্ধকার জাল ছিন্ন করতে হলে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে—সচেতনতা, নৈতিকতা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ নিয়েই। তখনই হয়তো আমরা বলতে পারব—প্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদ, অভিশাপ নয়।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply