
আব্দুর রউফ ভুঁইয়া,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদে টানা ২৬ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে খতম তারাবিহ পড়িয়ে প্রশংসায় ভাসছেন মাওলানা মাহফুজুর রহমান।
১৯৯৩ সালে দেশের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ. তাঁকে রমজান মাসে তারাবির নামাজে ইমামের পেছনে তেলাওয়াত শ্রবণকারীর দায়িত্ব দেন। টানা আট বছর ওই দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ সাল থেকে তিনি নিজেই খতম তারাবিহর ইমামতি শুরু করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে একই মসজিদে তারাবিহ পড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। এর আগে একই মসজিদে একাধারে ৪২ বছর খতম তারাবিহ পড়িয়ে নজির স্থাপন করেছিলেন আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ।
মাওলানা মাহফুজুর রহমান কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের চর শোলাকিয়ার বাসিন্দা, মফিজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদরাসা থেকে ১৯৮২ সালে হিফজুল কোরআন বিভাগে ভর্তি হয়ে মাত্র এক বছরে পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। পরবর্তীতে একই মাদরাসা থেকে কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন হাফেজ মো. মাহমুদুল হাসান মোহাম্মদ সফিউল্লাহ ও হাফেজ আতহার রাসেল তারাবির নামাজের ইমামতি করছেন। তারাবির প্রথম আট রাকাত পড়ান হাফেজ মাহফুজুর রহমান, বাকি নামাজ তিনজন মিলে সম্পন্ন করেন।
শহীদি মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি মিজানুর রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরে তিনি এখানে তারাবিহ আদায় করছেন, এখন তাঁর ছেলেও নিয়মিত আসে। হাফেজ মাহফুজুর রহমানের তিলাওয়াত খুবই শ্রুতিমধুর। প্রতিটি হরফ স্পষ্ট ও পরিমিত উচ্চারণে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে অনেক প্রশান্তি লাগে।
করিমগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা মুসল্লি রাকিবুল ইসলাম জানান, রমজান মাসে মাহফুজ হুজুরের পেছনে খতম তারাবিহ পড়ার জন্য তিনি টানা ১০ বছর ধরে আসছেন। নামাজ শেষে আবার ফিরে যান। হুজুরের তেলাওয়াত খুবই চমৎকার। ২৬ বছর ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে ইমামতি করছেন জেনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেলো।
মাওলানা মাহফুজুর রহমান জানান, তাঁর বাড়ির পাশেই অবস্থিত শহীদি মসজিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ১৯৮০ সাল থেকে। তিনি ১৯৯৩ সালে আল্লামা আনোয়ার শাহের পেছনে শ্রবণকারী হিসেবে দায়িত্ব নেন। একদিন তারাবিহ নামাজে ইমাম সাহেব তিলাওয়াতে সামান্য ভুল করলে তিনি লোকমা দেন। নামাজ শেষে আল্লামা আনোয়ার শাহ তাঁকে ডেকে নিজের পেছনে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তেলাওয়াত শ্রবণকারীর দায়িত্ব অর্পণ করেন। টানা আট বছর ওই দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ সাল থেকে তিনি নিজেই খতম তারাবিহ পড়ানো শুরু করেন। আল্লাহর রহমত, ওস্তাদদের দোয়া এবং মুসল্লিদের ভালোবাসায় দীর্ঘদিন সুস্থ থেকে একই মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন বলে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মাওলানা মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। যত দিন সুস্থ থাকব, কোরআনের খেদমতেই থাকতে চাই।
মসজিদের মোতাওয়ালি ও আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বির আহমাদ বলেন, শহীদি মসজিদ কিশোরগঞ্জের কেন্দ্রীয় মসজিদ। তারাবিহ ও জুমার নামাজে এখানে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লির সমাগম হয়। “হাফেজ মাহফুজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে তারাবিহ পড়াচ্ছেন। যত দিন তিনি সক্ষম থাকবেন, আমরা চাই তিনি এখানেই নামাজ পড়ান।
উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালের ২৪ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পুরান থানায় অবস্থিত এই মসজিদে ব্রিটিশ সেনাদের অতর্কিত হামলা ও গুলিবর্ষণে ভেতরে পাঁচ মুসল্লি শহীদ হন। সেই ঘটনার পর থেকেই মসজিদটির নাম হয় শহীদি মসজিদ। আজও মসজিদের তিনটি পিলারে গুলির চিহ্ন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালের ২৪ অক্টোবর, মসজিদটিতে একদা মুসল্লীরা নামাজ আদায় করছে তখন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের পূজা উৎসব পালন করার জন্য মসজিদের পাশ দিয়ে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে যাচ্ছিল যার কারণে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে সমস্যা সৃষ্টি হয়। তখন অনেক মুসল্লি হিন্দুদের বাধা দেয় এবং যার ফলে একটি সংঘর্ষ তৈরি হয়। সেই সংঘর্ষকে থামানোর জন্য ব্রিটিশ পুলিশ মুসল্লিদের উপর গুলিবর্ষণ করে ফলে অনেক মুসল্লি শহীদ হয় এবং অনেকে আহত হয়। তখন থেকে এর নামকরণ করা হয় শহীদী মসজিদ। আজও মসজিদের তিনটি পিলারে সেই গুলির চিহ্ন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। দেশ বিখ্যাত পাগলা সমজিদের পর কিশোরগঞ্জের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় মসজিদ হলো শহীদী মসজিদ।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply