
আব্দুর রউফ দুদু গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধিঃ-
রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ছাত্রদল নেতা ইয়াসিন শেখের বাড়িতে শনিবার (৫ এপ্রিল/২৫) যান বিএনপির প্রতিনিধি দল। এ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার।
তিনি বলেন, ইয়াসিন ছাত্রদলের একজন লড়াকু সৈনিক। সে ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলো। তার যতোবার চাকুরি হয়েছে, ততবার শুধু ছাত্রদল করার কারণে সেই চাকুরির নিয়োগপত্র বাতিল করা হয়েছে। তার বাবার সেই ইচ্ছে পূরণের জন্য রাশিয়া গিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তার পরিবারে যে আনন্দের বন্যায় বয়েছিলো, তা মুর্হূতের বিষাদে রূপ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইয়াসিনের পাশে আমরা আছি, আমাদের নেতা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলীয় সকল নেতৃবৃন্দ রয়েছেন। ইয়াসিনের মা, আমাদের সবার মা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে আর্থিক কিছু অনুদান আজকে দেয়া হয়েছে এবং একটি নতুন ঘরও উপহার দেয়া হবে। সেই ঘরটি করার জন্য আর্থিক সহযোগিতা দিবেন এ এলাকার কৃতী সন্তান সার্জেন্ট ইকবাল হোসেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণ, অ্যাডভোকেট নুরুল হক, হাফেজ মো. আজিজুল হক, মো. হাবিবুর ইসলাম খান শহিদ, আব্দুল আজিজ মন্ডল, এসএম দুলাল, সুজিত কুমার দাস, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসিম সাত্তার মন্ডল, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রহমান বাবুল, জর্জকোর্টের আইনজীবী এডভোকেট আবু জাফর রাশেদ মিলন, কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ সাধারণ সম্পাদক শাহ নাসির উদ্দিন রুমন, ময়মনসিংহ উত্তর মহিলা দলের সভাপতি তানজিন চৌধুরী লিলি, উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর আনিছ, উত্তর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান সোহেল প্রমুখ।
পুত্র হারিয়ে বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন ইয়াসিন মিয়া শেখের মা ফিরোজা বেগম। তিনি বলেন, আমার পুতটারে এনে দেন, আর কিছু চাই না, পুতটারে এনে দেন। তিনি আরও বলেন, আমার ছেলের চাকুরি হয়েছিলো। নিয়োগপত্রও পেয়েছিলো। তারপরে যখন জানলো ছাত্রদল করে তখন তার নিয়োগপত্র বাতিল করে দেয়া হলো। শুধু ছাত্রদল করার কারণেই সে চাকুরি পায়নি।
ইয়াসিন মিয়া শেখ ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালী গ্রামের মৃত আব্দুস সাত্তার শেখের পুত্র। গত ২৭ মার্চ রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে তিনি নিহত হন। এ খবর পরিবার জানতে পারে ১ এপ্রিল। উঁচু-লম্বা আর সুন্দর চেহারার অধিকারী ইয়াছিন সেনাবাহিনীতে যোগ দিবে এটা ছিলো তার বাবার ইচ্ছে। ডৌহাখলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৯ এসএসসি পাশ করে। এরপরে দেশের মাটিতে সৈনিকে যোগ দিতে একাধিকার সেনাবাহিনীর লাইনেও দাঁড়িয়ে ছিলো সে। ২০২১ সনে এইচএসসি উর্ত্তীণ হয়। এরপরে বঙ্গবন্ধু কলেজে অনার্স অধ্যয়নরত ছিলো।
সেই ভিডিও বার্তায় ইয়াসিন জানায়, গত বছরের জানুয়ারিতে রাশিয়ায় একটি কোম্পানিতে চাকুরির জন্য আবেদন করে। গত সেপ্টেম্বর মাসে অফার লেটার পেয়ে চলে যায় রাশিয়া। মস্কো থেকে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দূরের ওই কোম্পানিতে তিন মাস চাকুরির পর অনলাইনে আবেদন করে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে যোগ দেন।
তিনি জানান, দেশে না হলেও বিদেশে সৈনিক হয়ে বাবার স্বপ্নপূরণ হয় বলেও জানায় সে। ওই ভিডিওতে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিচারণ ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের জন্যও দোয়া প্রার্থনা করেন সাবেক এই ছাত্রদল কর্মী। যুদ্ধে মৃত্যু হলেও তার কোনো আফসোস থাকবে না বলে ভিডিও বার্তায় জানিয়ে দেয় ইয়াসিন। সে আরও উল্লেখ করে ২০২৩সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে আন্দোলনে গিয়েছি, হরতাল-জ¦ালাও-পোড়াও এর ভিতর দিয়ে অসংখ্যবার জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছি। সেদিন বিচারপতির বাসভবনে হামলার ঘটনায় বেড়িকেটে পড়েছিলাম। সেই বেড়িকেট ভেঙে এসেছি। এতে আমি যুদ্ধে যাওয়ার সাহস পেয়েছি, যুদ্ধে মৃত্যু হলেও আমার এখন কোনো আফসোস থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, আমি মাহে রমজানের এই দিনে আমি আমার নেতা গৌরীপুরের জনমানুষের নেতা আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণসহ দলীয় নেতাকর্মীকেও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তার বাবাকে হারান ২০১৬সানের ১মার্চ। বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর পোষাক পড়ে নিজের শরীরের পোষাক স্পর্শ করে ইয়াছিন বলে উঠেন, বাবার মৃত্যু বার্ষিকী এই পোশাক বাবাকে উৎসর্গ করলাম।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস-জীবন যুদ্ধের এক ইতিহাস এখন ইয়াসিন! ওই ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করার মাস না পেরুতেই যুদ্ধে ইউক্রেনের মিসাইল হামলায় নিহত হয় তিনি।
ইয়াসিনের চাচাতো ভাই রবিকুল ইসলাম রবি জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে রাশিয়ান ভাষা শেখে ইয়াসিন। পরে বন্ধুর সহায়তার ইয়াসিন রাশিয়ায় একটি কোম্পানিতে ভালো চাকরি পায়। সবই ঠিকটাক মতো চলছিল। পরে রাশিয়া সেনাবাহিনী যোগ দিয়ে সব উলটপালট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়ায় যাওয়ার সময় ইয়াসিনের মা ও বড় ভাইকে গাড়িতে করে ঢাকায় নিয়ে অনাপত্তিপত্রে তাদের স্বাক্ষর নেয় রাশিয়ায় পাঠানো এজেন্সির লোকজন। গত ২৬ মার্চ তার মা ফিরোজা বেগমের সাথে শেষবারের মতো কথা বলে ইয়াসিন। কয়েকদিনের মধ্যেই দশ লাখ টাকা পাঠাবে বলে মাকে জানিয়েছিলো সে।’
নিহত ইয়াসিনের মরদেহের কী অবস্থা, মরদেহ দেশে আনা যাবে কী না তা নিয়ে কোনো তথ্যই পাচ্ছে না ইয়াসিনের পরিবার। ছেলের ছবি নিয়ে মায়ের কান্না থামছেই না। শোকে হতবিহবল পরিবারের সদস্যরা। এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
এ দিকে খবর পেয়ে গৌরীপুর পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা মরিচালি গ্রামে ইয়াসিনের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম সাজ্জাদুল হাসান জানান, বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এ ব্যাপারে সকল প্রকার আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply