
মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম চট্টগ্রাম বাঁশখালী প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শীলকূপ ইউনিয়নের মনকিচর এলাকায় মাদকাসক্ত এক যুবককে ৯ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নিজের পরিবারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে তাকে দণ্ডিত করা হয়। ঘটনাটির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক ছিল—অভিযুক্তের মা নিজেই সন্তানের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।
রোববার (৭ জুন) রাত ৯টার দিকে শীলকূপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মনকিচর গ্রামের বদুর বাপের বাড়ির এলাকায় স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় শীলকূপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ নূরী এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশের সহযোগিতায় মো. শহীদুল্লাহ (১৯) নামের ওই যুবককে আটক করা হয়।
পরে বাঁশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর সানী আকনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। আদালতে উপস্থিত হয়ে অভিযুক্তের মা মর্তুজা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মাদকাসক্তির কারণে তার ছেলে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে।
তিনি আদালতকে বলেন, মাদকের টাকা জোগাড় করতে শহীদুল্লাহ নিয়মিত চুরি করত। তার বিরুদ্ধে এলাকায় ২০টিরও বেশি মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রায়ই বাড়িতে ভাঙচুর চালানো, পরিবারের সদস্যদের মারধর এবং অশান্তি সৃষ্টি করা ছিল তার নিত্যদিনের ঘটনা।
স্থানীয় বাসিন্দারাও আদালতকে জানান, অভিযুক্ত যুবক প্রায়ই মাদকাসক্ত অবস্থায় এলাকায় অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করত এবং নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করত। তার কর্মকাণ্ডে পরিবারসহ এলাকার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অতিষ্ঠ ছিল।
মর্তুজা বেগম আদালতের উদ্দেশে বলেন, “আমি একজন মা হয়েও আমার সন্তানের শাস্তি চাইছি। তার মাদকাসক্তির কারণে আমরা পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় আছি। ঘরে কোনো শান্তি নেই। ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রশাসন যেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।”
শীলকূপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ নূরী বলেন, “স্থানীয়দের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। মাদকাসক্তির কারণে ওই যুবক নিজের পরিবার ও সমাজের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রশাসনের সহযোগিতায় তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।”
ভ্রাম্যমাণ আদালতের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর সানী আকন জানান, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ, উপস্থিত সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তার নিজস্ব স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারায় তাকে ৯ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মাদক পরিবার ও সমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি এবং মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত শহীদুল্লাহকে কারাগারে পাঠানো হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শীলকূপের এ ঘটনা সমাজে মাদকের ভয়াবহ প্রভাবের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। তারা মনে করেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব। একই সঙ্গে একজন মা নিজের সন্তানের অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply