
*সবুজ সরদার উপজেলা প্রতিনিধি লোহাগড়া নড়াইল
*কাঞ্চনপুর, লোহাগড়া:*
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাঞ্চনপুর মহাশ্মশান শত শত বছরের ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের ধারক হয়ে আছে। মহাশ্মশান চত্বরে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি প্রাচীন বৃক্ষ: একটি গাব গাছ, একটি বটগাছ ও একটি তমাল গাছ।
*গাব গাছে ইট বেঁধে মানত*
মহাশ্মশানের প্রধান আকর্ষণ শতবর্ষী গাব গাছটি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এই গাছে ইট বেঁধে মানত করলে মনের বাসনা পূরণ হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, গাছটির শাখা-প্রশাখায় ঝুলছে শত শত ইটের টুকরো ও লাল সুতো। রোগমুক্তি, সন্তান লাভ, চাকরি, ব্যবসায় উন্নতি ও মামলায় জয়ের আশায় নড়াইলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন ভক্তরা এখানে আসেন।
ইতনা গ্রামের গৃহবধূ শেফালী মণ্ডল বলেন, “আমার ছেলের বিদেশ যাওয়া আটকে ছিল। এই গাব গাছে ইট বেঁধে মানত করার এক মাসের মধ্যে ভিসা হয়ে গেছে।”
*বট-তমাল তলে পূজা, চত্বরে তিন মন্দির*
গাব গাছের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বটগাছ ও তমাল গাছ। এই দুটি গাছের বাঁধানো বেদীতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা পূজা-অর্চনা হয়। অমাবস্যা ও শনি-মঙ্গলবারে ভক্তদের ভিড় বাড়ে।
মহাশ্মশান চত্বরেই পাশাপাশি অবস্থিত কালী মন্দির, গোবিন্দ মন্দির ও হরি মন্দির। তিনটি মন্দিরেই নিত্যসেবা ও সন্ধ্যা আরতি হয়। কালীপূজা ও জন্মাষ্টমীতে বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
*৩২ প্রহর নামযজ্ঞ ও ধর্মীয় শিক্ষা*
এই মহাশ্মশানের সবচেয়ে বড় আয়োজন ৩২ প্রহরব্যাপী মহানামযজ্ঞ। কাঞ্চনপুরসহ আশপাশের ১৪ থেকে ১৫টি গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় এই নামযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। টানা চার দিন হরিনাম সংকীর্তনে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা।
পাশাপাশি মহাশ্মশান চত্বরে নিয়মিত হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষা পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের গীতা, চণ্ডী ও নিত্যকর্ম শেখানো হয়।
নামযজ্ঞ পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রশান্ত ঘোষ জানান, “১৪-১৫টি গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় আমরা এই ৩২ প্রহর নামযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছি। নতুন প্রজন্মকে ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই পাঠদান চালু করেছি।”
*৩০০ বছরের ইতিহাস*
প্রবীণদের মতে, কাঞ্চনপুর মহাশ্মশান ও এই বৃক্ষগুলোর বয়স প্রায় ৩০০ বছর। মহাশ্মশান কমিটির সভাপতিপ্রশান্ত ঘোষ বলেন, “এই স্থান আমাদের সম্প্রীতির প্রতীক। পূজা-অনুষ্ঠানে হিন্দু-মুসলিম সবাই সহযোগিতা করে।”
*সংরক্ষণের দাবি*
স্থানীয়দের দাবি, প্রাচীন এই বৃক্ষ, মন্দির ও মহাশ্মশানটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষণ করা হোক। এতে ইতিহাস রক্ষার পাশাপাশি পর্যটনের বিকাশ ঘটবে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply