
মো. শাহীন আলম গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের তিস্তা শাখা নদীর ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বছরের পর বছর ধরে একটি জরাজীর্ণ কাঠের সাঁকো দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন—সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে সেতুর দাবি জানিয়ে এলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি তাদের স্বপ্নের ব্রিজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বেলকা ইউনিয়নের চর বেলকা, চর চরিতাবাড়ী, জিগাবাড়ী, কাশিম বাজার, বজরা, উজান চেওড়া, চর বজরা, মহিষবান্দিসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা তিস্তা শাখা নদীর ওপর নির্মিত কাঠের সাঁকো। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধরা ঝুঁকি নিয়েই এই সাঁকো পার হন।
স্থানীয় বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের গ্রামের কয়েক শতাধিক পরিবারের চলাচলের একমাত্র ভরসা এই কাঠের সাঁকো। এর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনেক কাঠ পচে গেছে, বিভিন্ন জায়গায় পাটাতন উঠে বড় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। কোথাও দড়ি দিয়ে কাঠ বেঁধে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। একসঙ্গে দুজন মানুষ উঠলেই পুরো সাঁকো দুলতে শুরু করে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৪০ বছর ধরে তারা একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রতিটি নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি মিললেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
চর চরিতাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যেতে এই ভাঙাচোরা সাঁকো পার হতে হয়। “এক হাতে বই, অন্য হাতে সাঁকো ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে হয়। খুব ভয় লাগে। একটি পাকা সেতু হলে আমাদের অনেক কষ্ট কমে যেত,” বলে সে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আউয়াল প্রতিদিন নদীর ওপারে জমিতে কাজ করতে যান। হাতে কৃষি সরঞ্জাম ও কাঁধে ফসলের বোঝা নিয়ে ঝুঁকি নিয়েই সাঁকো পার হতে হয় তাকে। তিনি বলেন, “ভয় তো সবসময়ই লাগে। কিন্তু উপায় কী? এই সাঁকো ছাড়া নদী পার হওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হয়।”
যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা শুধু যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনেও। এলাকাবাসীর দাবি, সেতু ও পাকা সড়কের অভাবে সন্তানদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি বিয়ের প্রস্তাবও অনেক সময় ভেঙে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্ভোগের কথা শুনে অনেক পরিবার সম্পর্ক করতে আগ্রহ দেখায় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নবিয়াল বলেন, “একটি পাকা সেতু নির্মাণ হলে পুরো এলাকার জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির চিত্র বদলে যেত। বর্তমানে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।”
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ জানান, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় জরাজীর্ণ কাঠের সাঁকোটি সংস্কার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নতুন কাঠ বসানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত পাটাতন মেরামত করা হয়েছে। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তিনি বলেন, “চরাঞ্চলের মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য দ্রুত একটি ব্রিজ ও পাকা সড়ক নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। এতে এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।”
এ বিষয়ে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাজেদুর রহমান বলেন, “বেলকা তিস্তা শাখা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনি ব্রিজ নির্মাণের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। আশা করছি, খুব শিগগিরই প্রকল্পটির বরাদ্দ পাওয়া যাবে।”
দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় এখন সুন্দরগঞ্জের চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, আর প্রতিশ্রুতি নয়—দ্রুত নির্মিত হোক একটি স্থায়ী সেতু, যা নিরাপদ করবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply