
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি শেখ সাদী সুমন
আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংগঠন ‘রোটারি ইন্টারন্যাশনাল (বাংলাদেশ)’-এর আড়ালে অনুমোদনহীন ব্যাংকিং কার্যক্রম, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার (মানি লন্ডারিং), কর ফাঁকি এবং সন্দেহজনক তহবিল সংগ্রহের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারের কোনো বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা বা হালনাগাদ অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ‘ফিসক্যাল এজেন্ট’ সেজে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে একাধিক হিসাব পরিচালনা করছেন এবং দেশের বাইরে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পাচার করছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
গত ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে রোটারি ক্লাব অফ চিটাগং বেঙ্গল সিটি (ডিস্ট্রিক্ট-৬৫)-এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংগঠনের সাথে জড়িত রোটারিয়ান ইব্রাহিম খলিল মিন্টু দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর এই অভিযোগ দাখিল করেন।
যেসব গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে:
অনুমোদনহীন কার্যক্রম ও অবৈধ ব্যাংকিং: এনজিও বিষয়ক ব্যুরো বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো বৈধ ও হালনাগাদ নিবন্ধন ছাড়াই সংগঠনটি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সরকারের অনুমোদন ব্যতিরেকেই কতিপয় ব্যক্তি নিজেদের ‘ফিসক্যাল এজেন্ট’ দাবি করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছেন, যা The Foreign Donations Regulation Act, 2016-এর পরিপন্থী।
হুন্ডির মাধ্যমে সদস্য ফি পাচার: বাংলাদেশে সংগঠনটির প্রায় ৮,০০০ সদস্য রয়েছেন। প্রতি সদস্যের কাছ থেকে বার্ষিক ন্যূনতম ১০০ মার্কিন ডলার হারে আদায়কৃত মোট প্রায় ৮,০০,০০০ (আট লক্ষ) মার্কিন ডলার কোনো প্রকার বৈধ আইনি তদারকি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।
সন্দেহজনক অনুদান ও মানি লন্ডারিং: সংগঠনটির অভ্যন্তরে ‘এ কে এস (AKS) মেম্বার’ (প্রতিজনের ফি ২,৫০,০০০ ডলার), ‘মেজর ডোনার’ (ফি ১০,০০০ থেকে ২ লক্ষ ডলার) এবং পিএইচএফ (PhF) খাতের অধীনে কোটি কোটি টাকা ও পোলিও ফান্ডের নামে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগকারী জানান, বাংলাদেশের দুটি ডিস্ট্রিক্ট থেকে প্রতি বছর সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা হয়। আয়কর রিটার্ন বা আয়ের বৈধ উৎস যাচাই না করেই ২০১২ সাল থেকে ‘দি রোটারি ফাউন্ডেশন’ ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের অ্যাকাউন্ট থেকে এই মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অবৈধ প্রক্রিয়ায় সরাসরি বিদেশে পাচার করা হচ্ছে ।
অথচ সাধারণ রোটারিয়ানদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ছিল যে, রোটারি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক চাঁদা এবং দ্য রোটারি ফাউন্ডেশনের (TRF) বিভিন্ন অনুদান, যেমন AKS ও Major Donor ফান্ড, বাংলাদেশ থেকে দেশের বাইরে স্থানান্তরের কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ উঠেছে যে গত কয়েক বছর ধরে এসব অর্থ যথাযথ সরকারি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে বিদেশে স্থানান্তর করা হচ্ছে। বিষয়টি এখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে।
কনফারেন্সের মাধ্যমে কর ফাঁকি: বিগত ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত একটি কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রায় ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) মার্কিন ডলার (নগদ ও চেকে) সংগ্রহ করা হয়, যা সরকারি কর ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশে পাচারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সন্দেহজনক ব্যাংক হিসাবসমূহ:
অভিযোগে এই অবৈধ আর্থিক লেনদেন, রূপান্তর ও পাচার প্রক্রিয়ার নেপথ্যে মূল হোতা হিসেবে তিনজনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
১. ইশতিয়াক জামান: সাবেক জেলা গভর্নর (PDG), গুলশান-২, ঢাকা।
২. মোহাম্মদ আইয়ুব: পিডিজি ও ফিসক্যাল এজেন্ট, শান্তিনগর, ঢাকা।
৩. আশীষ ঘোষ: ভারতীয় নাগরিক, যিনি গত ৩ বছর ধরে নেপথ্য থেকে এই অবৈধ প্রক্রিয়ার মূল সমন্বয় করছেন।
এই চক্রটি আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি (মতিঝিল সেনা কল্যাণ ভবন শাখা) এবং ঢাকা ব্যাংক পিএলসি (গুলশান শাখা)-তে পরিচালিত নিম্নোক্ত ব্যাংক হিসাবগুলোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন ও রূপান্তর করছে বলে জানা গেছে:
The Rotary Foundation (হিসাব নং: 0003-0210013221)
Rotary International (হিসাব নং: 0003021001312)
Annual Rotary Conference 2026 (হিসাব নং: 1021000006765)
Rotary ILTS 2026 (হিসাব নং: 1021000006823)
আইনি পদক্ষেপের দাবি:
অভিযোগকারী ইব্রাহিম খলিল মিন্টু তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেন, বর্ণিত এই কার্যক্রমগুলো প্রথম দৃষ্টিতেই (Prima Facie) মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ধারা ২(৭) ও ৪, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ধারা ৫ ও ৮, এবং আয়কর আইন, ২০২৩ ও দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর প্রাসঙ্গিক ধারা অনুযায়ী স্পষ্ট দণ্ডনীয় অপরাধ।
রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, কর ফাঁকি রোধ এবং আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার চক্রকে রুখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিজস্ব এখতিয়ারে বিষয়টিকে আমলে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান (Inquiry) শুরু করার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, উক্ত অভিযোগের অনুলিপি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান এবং ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়েও প্রেরণ করা হয়েছে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply