
মোহাম্মদ করিম,লামা – আলীকদম প্রতিনিধি
পাহাড়, নদী আর সবুজে ঘেরা মনোরম ও জনবহুল এক জনপদ বান্দরবানের লামা উপজেলা। এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারের নানামুখী উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন শত শত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু পর্দার পেছনের এই মানুষগুলোর দৈনন্দিন যাপন যে কতটা কঠিন, তা হয়তো অনেকেরই অজানা।
তীব্র আবাসন সংকটের কারণে একদিকে যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি ব্যাহত হচ্ছে উপজেলার জরুরি নাগরিক সেবা। বর্তমানে লামা উপজেলায় কর্মরত ১,৩২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে থাকার জন্য কোনো সরকারি ডরমিটরি বা আবাসন কোয়ার্টার নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মেসে বা জরাজীর্ণ বাসা-বাড়িতে কয়েকজন কর্মচারী একসঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে থাকছেন অতি সাধারণ পাহাড়ি ঘরবাড়িতে, যেখানে ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও অনুপস্থিত।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লামা থানা গঠিত হয়। ১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবর আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাইশারী ও গজালিয়া থানাকে নিয়ে এটি ‘লামা মহকুমা’য় উন্নীত হয়। ১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের শাসনামলে প্রশাসন বিকেন্দ্রেীকরণের আওতায় দেশের সব মহকুমা বিলুপ্ত করে জেলা ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন সরকারি প্রজ্ঞাপনে লামাকে জেলা ঘোষণা করা হলেও তা মাত্র ৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল। তবে মহকুমা ও জেলা ঘোষণার ইতিহাসের কারণে একটি জেলা শহরে সরকারের প্রশাসনিক কাজের যতগুলো দপ্তর থাকে, তার প্রায় সবই রয়ে গেছে এই উপজেলায়।
উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগ ও পোস্ট অফিস বাদে বর্তমানে লামা উপজেলায় সরকারের ৩৩টি দপ্তর রয়েছে। এসব দপ্তরে বর্তমানে ১৪২ জন কর্মকর্তা এবং ১,১৮৩ জন কর্মচারীসহ সর্বমোট ১,৩২৫ জন কর্মী কর্মরত আছেন।
আবাসন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে দাপ্তরিক কাজে। দূরবর্তী স্থান থেকে যাতায়াত করতে গিয়ে যেমন সময় অপচয় হচ্ছে, তেমনি অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা। বিশেষ করে জরুরি সেবার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
লামা উপজেলা প্রশাসনের উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা উচিংমে চাক বলেন, “নারী হিসেবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবাসন সুবিধা না থাকাটা সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট। পরিবার নিয়ে থাকার মতো ভালো বাসা এখানে পাওয়াই যায় না, আর পেলেও ভাড়া আকাশচুম্বী।”
সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা বামং সিং মার্মা বলেন, “অফিস শেষ করে একটু শান্তিতে যে বিশ্রাম নেব, সেই পরিবেশটুকুও নেই। ভাঙাচোরা মেসবাড়িতে থাকতে হয়। ডরমিটরি থাকলে আমাদের কাজের মনোযোগ আরও বাড়ত।”
সহকারী তথ্য অফিসার মোহাম্মদ রাশেদুল হক রাসেদ বলেন, “দূর-দূরান্ত থেকে বদলি হয়ে আসা চাকরিজীবীদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েই পড়তে হচ্ছে চরম আবাসন সংকটে। সুনির্দিষ্ট আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় এলাকায় চড়া মূল্যে বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেকেই বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন দূরে রেখে একাকী মেস জীবন কাটাচ্ছেন।”
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কাঞ্চন দে বলেন, “পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে যারা নিজেদের শ্রম ও মেধা উৎসর্গ করছেন, তাদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সময়ের দাবি। লামায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আধুনিক ডরমিটরি বা কোয়ার্টার নির্মাণ এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং সেবার মান বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।”
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, বান্দরবানের ৭টি উপজেলার মধ্যে ৬টিতেই অফিসার্স কোয়ার্টার ও ডরমিটরি থাকলেও, কেবলমাত্র লামা উপজেলাতেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই।
তিনি আরও জানান, লামা উপজেলায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক গেজেটেড কোয়ার্টার ও ডরমিটরি নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের নিকট ইতিমধ্যে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে প্রস্তাব আকারে সম্ভাব্য স্থানগুলোর নকশা তৈরি ও পরিচিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত এই আবাসন সংকটের সমাধান করে পাহাড়ি জনপদের এই জনগুরুত্বপূর্ণ উপজেলার সেবার মান অক্ষুণ্ণ রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply