
এনামুল হক নাসিম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি :
এক সময়কার শুষ্ক ও মরুপ্রায় বরেন্দ্র জনপদ এখন দেশের অন্যতম শস্য ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, খাল খনন এবং ভূ-পরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সদর উপজেলার প্রবীণ কৃষক জুবায়ের হোসেন জানান, বিএমডিএ’র উদ্যোগে খাল খনন করে নদী থেকে পানি সরবরাহ এবং পুকুর পুনঃখননের ফলে চাষাবাদ সহজ হয়েছে। এতে যেমন কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতাও কমেছে। তিনি বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই কৃষি নিশ্চিত হবে।”চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিএমডিএ রিজিয়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১,৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্পের মাধ্যমে প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন হচ্ছে, যেখানে আগে একটিমাত্র ফসল হতো। এতে উপকৃত হচ্ছেন প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কৃষক পরিবার। মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদী থেকে ১০০টি এলএলপি পাম্পের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। বছরে প্রায় ৬.৫০ লাখ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১,৬২৫ কোটি টাকা। পানির অপচয় রোধে ২০০৩ সালে চালু করা হয় স্মার্ট কার্ডভিত্তিক প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা। পরিবেশ রক্ষায় এ পর্যন্ত ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এছাড়া ২৩০
কিলোমিটার খাল খনন এবং ১,০৯১টি পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বিএমডিএ। ২৩৪টি স্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ১,৪০০ কিলোমিটার সেচ নালা এবং ১৮৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের ফলে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশিদ জানান, মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার করে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা বাড়াতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ডাবল লিফটিং পদ্ধতির প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ৮৩৯ কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮৭ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর আওতায় ২১০ কিলোমিটার খাল ও ১৫০টি পুকুর পুনঃখনন, ৫ লাখ ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণ এবং সোলার সেচ যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ৬ কিলোমিটার খাল এবং চুড়ইল ও কালন বিল পুনঃখননের কাজ চলমান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বয়ে বিএমডিএ যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তা শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়—সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতিতে আরও বড় পরিবর্তন আসবে।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply