
বিশেষ প্রতিনিধি মোঃ জহির খান
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বোতলজাত পানির উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের করা একটি মামলায় তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, জনস্বার্থে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ এবং পুলিশের আইনগত পদক্ষেপের স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন দৈনিক জনবাণী পত্রিকার সংবাদকর্মী। তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
কারখানায় কাজ করে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২ অক্টোবর তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানায় কাজ শুরু করেন সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন। সেখানে বোতলজাত পানির উৎপাদন প্রক্রিয়া, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা এবং পানির মান নিয়ে কথিত অনিয়মের বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। পরে প্রতিবেদনটি একাধিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট একটি পণ্যের উৎপাদন ও বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের যথাযথ তদন্তের দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত পদক্ষেপের স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর গ্রেপ্তার
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের পর মুসকান কর্তৃপক্ষ সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে ডেকে নেয় এবং লিখিত অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে খবর দেয়। এরপর সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুর উল্লাহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরবর্তী সময়ে সীতাকুণ্ড থানার ৫৬ নম্বর মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইনে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। তবে মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রেপ্তারের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ফলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রকৃত কারণ, গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি এবং ঘটনার পেছনের পুরো বিষয়টি জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভেজাল পানির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি
বোতলজাত পানির মান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, ভেজাল ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা করা জরুরি। প্রয়োজনে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, উৎপাদনপ্রক্রিয়া পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য-প্রমাণের সত্যতা যাচাই করাও প্রয়োজন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় গোপনে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও সংগৃহীত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, জনস্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোনো প্রতিবেদনের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিকার আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি, প্রযোজ্য আইন এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্বচ্ছভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এস এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতাকে ঘিরে পুরোনো ঋণসংক্রান্ত অভিযোগ
এদিকে, মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটারের মূল প্রতিষ্ঠান এস এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শাহাবুদ্দিন আলমকে ঘিরে অতীতে ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঋণসংক্রান্ত মামলা ও বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপের খবরও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ঋণসংক্রান্ত অভিযোগে সিআইডি তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০২৩ সালে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবরও প্রকাশিত হয়। তবে এসব অভিযোগ ও মামলার বর্তমান অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অতীতের ঋণসংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের গ্রেপ্তারের সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন তথ্যও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, নাকি জনস্বার্থের প্রশ্ন?
সীতাকুণ্ডের এ ঘটনায় দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, বোতলজাত পানির মান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার অভিযোগ, গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি এবং পুলিশি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
সাংবাদিকতার নামে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য প্রকাশের সুযোগ যেমন থাকা উচিত নয়, তেমনি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুসন্ধান ও তথ্য প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক যেন আইনবহির্ভূত হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রকৃত অভিযোগ স্পষ্ট করা, গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি যাচাই করা এবং মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার পানির মান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—দুটিই জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ ঘটনায় কোনো পক্ষের বক্তব্য বা অভিযোগকে আগাম সত্য ধরে না নিয়ে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
© All rights reserved © 2026
Leave a Reply