
মনির খান নড়াইল জেলা প্রতিনিধি।
নড়াইল-২ সংসদীয় আসনে ঈদুল ফিতর ২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের আওতায় বিতরণ করা শাড়ি ও নগদ অর্থ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের একাংশ দাবি করেছেন, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী এক হাজার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তারা শুধু শাড়ি পেয়েছেন, নগদ অর্থ পাননি। এছাড়া বিতরণ কার্যক্রমে কোনো মাস্টাররোল বা উপকারভোগীর তালিকা সংরক্ষণ না করার অভিযোগও উঠেছে।
জানা গেছে, ঈদুল ফিতর ২০২৬ উপলক্ষে নড়াইল-২ সংসদীয় আসনে (লোহাগড়া ও নড়াইল সদরের অংশ) প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা নগদ অর্থ এবং ৭০০টি শাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আসনের ২০টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার ১৯৮টি ওয়ার্ডে এসব সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, লোহাগড়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃত উপকারভোগীদের সবাই সেই অর্থ পাননি। বরাদ্দ অনুযায়ী ৫৫৮ জনকে এক হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক নারী জানিয়েছেন, তারা শুধুমাত্র শাড়ি পেয়েছেন।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অনেক উপকারভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা অসহায় গরিব মানুষ আমরা যদি প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার না পায় তাহলে কারা পেল? আবার অনেকেই বলছেন“আমাদের শাড়ি দিয়েছে, কিন্তু এক হাজার টাকা দেয়নি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক জায়গায় কোনো স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা বা মাস্টাররোল ছাড়াই নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত অসহায়দের বাদ দিয়ে নিজেদের লোকজনের মধ্যে সহায়তা বণ্টনের অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর মাধ্যমে এসব অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বরাদ্দের একটি অংশ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বণ্টন করা হলেও প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের অনেকে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা শাখার সহকারী সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরান হোসেন বলেন,আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জোট থেকে মোট ৩০৪ জনের তালিকা দিয়েছিলাম এবং সেই তালিকা অনুযায়ী বিতরণ করা হয়েছে। তবে জামায়াতের মধ্যেও যারা অসহায় ও দুঃস্থ ছিল, তাদেরকেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও লোহাগড়া উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন,
আমাদের বিএনপিকে প্রায় ১৫০টির মতো দেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো তালিকা ছাড়াই বিতরণ করা হয়েছে।
সচেতন মহল বলছেন, এমনিতেই বিতরণ কার্যক্রমে অস্বচ্ছতা, তার ওপর জামায়াতের ৩০৮ জোনের তালিকা ও বিএনপি’র ১৫০ জন, তাহলে বাকি ১০০ জনের তালিকা গেল কোথায়?
অভিযোগ রয়েছে, পুরো বিতরণ কার্যক্রমে যথাযথ মাস্টাররোল, স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা কিংবা উপকারভোগীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি, যা সরকারি সহায়তা বিতরণের নীতিমালার পরিপন্থী। এছাড়া রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাদের নিজেদের মতো করে বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন বলেই অসচ্ছতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উপকারভোগীদের।
এ বিষয়ে তথ্য জানার জন্য লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী কায়সার-এর কাছে একাধিকবার মাস্টাররোল ও উপকারভোগীদের তালিকা চাওয়া হলেও ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও তা পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, “এই বিতরণ কার্যক্রমে আমার উপস্থিত থাকা ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকা নেই।”
অন্যদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের (পিআইও) অফিস সহকারী অভিজিৎ কুমার মন্ডল-কে তালিকা সরবরাহের নির্দেশ দেন নির্বাহী কর্মকর্তা শাম্মী কায়সার। কিন্তু অভিজিৎ কুমার মন্ডল কয়েকদিন ধরে তালিকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাংবাদিককে ঘুরানোর পাশাপাশি টাকার প্রস্তাবও দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপরও এখন পর্যন্ত কোনো মাস্টাররোল বা উপকারভোগীদের তালিকা সরবরাহ করা যায়নি।
এ বিষয়ে নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন,
“প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঈদ উপহার আমি নিজে উদ্বোধন করেছি এবং তালিকা অনুযায়ী অনেকের মাঝে বিতরণও করেছি। এছাড়া আমাদের নেতাকর্মীরাও লোহাগড়া উপজেলার নির্ধারিত তালিকা অনুসারে উপহার বিতরণ করেছে। তবে লোহাগড়া উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে কিছু দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ইউএনও’র মাধ্যমে কীভাবে বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, সে বিষয়ে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তালিকার বাইরে বিতরণের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে আমি ইউএনও’র সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিব।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে,গরিব, অসহায়দের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর জীবনের প্রথম, ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সহায়তা কার্যক্রমে অস্বচ্ছতা খুবই দুঃখজনক। এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তারা দ্রুত উপকারভোগীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, বিতরণের সঠিক হিসাব জনসম্মুখে আনা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
© All rights reserved © 2023
Leave a Reply