লিয়াকত হোসেন জনী, মধুপুর(টাঙ্গাইল) :
চৈত্র মাসের ভ্যাপসা গরম ও রমজানের শুরুতে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি- ১ এর আওতাধীন ৫ উপজেলার তিন লক্ষাধিক গ্রাহক লোডশেডিং যন্ত্রণায় চরম কষ্ট ভোগ করে দিনাতিপাত করছেন। দেড় মাস আগে এ অঞ্চলের গ্রাহকদের
সুবিধার জন্য নির্মিত টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়ায় ১৩২/৩৩ কেভি পাওয়ার গ্রিড সাবস্টেশন কমিশন হয়েছে কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধা মিলছে না। টানা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা, চলমান রমজানে ঘন ঘন লোডশেডিং এর ঘটনায় স্থানীয় গ্রাহক পর্যায়ে চরম অসন্তোষ, ক্ষোভ
বিরাজ করছে লক্ষনীয় ভাবে।
জানা যায়, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রতিষ্ঠার পর ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতা বাড়তে থাকে। ফলে
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর ভৌগলিক এলাকা ময়মনসিংহ জেলার ৩টি উপজেলার ময়মনসিংহ সদর
(আংশিক),ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা এবং টাঙ্গাইল অংেশের মধুপুর, ধনবাড়ী. গোপালাপুর, ভূঞাপুর ও ঘাটাইলকে অন্তর্ভুক্ত করে বিস্তৃত হয়। ময়মনসিংহের অংশের চেয়ে টাঙ্গাইলের গ্রাহক সংখ্যা বেশি। আর এ
অঞ্চলের গ্রাহকগণ বিদ্যুৎ সুবিধায়ও পিছিয়ে সবচেয়ে বেশি । তাদের প্রতি বছর লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণাও
পোহাতে হয় চরম ভাবে। বিদ্যুৎ বিভাগের যাবতীয় কর্মকান্ড করতে গ্রাহকদের সদর দপ্তর ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা যেতে হয়। এ দিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দাপ্তরিক দায়িত্ব ময়মনসিংহ থেকে পালিত হলেও বিদ্যুৎ
সরবরাহ হয় মধুপুর থেকে ও ৫৪ কি.মি দূরের জামালপুর থেকে। কোন কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে ত্রুটি হলে টাঙ্গাইল অংশের বিশেষ করে মধুপুর, ধনবাড়ী ও গোপালপুরের সব গ্রাহককে দুর্ভোগে পড়তে হয়। সব দিক দিয়ে
টাঙ্গাইলের ৩ লাখ ১২ হাজার ৫শ জন গ্রাহক বৈষ্যমের শিকার ও বঞ্চিত। এসব বিবেচনায় ঘাটাইল উপজেলার
পাকুটিয়াতে সাব স্টেশন নির্মাণের মাধ্যমে দুর্ভোগ লাঘবের উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। টাঙ্গাইল-জামালপুর-
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়া বাজারের বিপরীত পাশে খোলা জায়গায়
নির্মিত জমির উপর গড়ে তোলা হয় ১৩২/৩৩ কেভি পাওয়ার গ্রিডের একটি সাব স্টেশনের। যে পাওয়ার গ্রিড
সাব স্টেশন বিদ্যুৎ সরবরাহে টাঙ্গাইলের ৫ টি উপজেলার এসব গ্রাহকদের সুবিধা দিবে। জানা গেছে, গত
ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখে স্টেশনের কমিশন (চালু) হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে লোড চাহিদা চেয়ে
আবেদনও করেছে। প্রায় দেড় মাস হতে চললো কিন্তু এ স্টেশনের বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় এখনো গ্রাহকগণ
আসেননি। সাব স্টেশন প্রস্তুত থাকার পরও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) অজানা
কারণে তিন দফা তারিখ পিছিয়ে চতুর্থবারের মতো গত ৬ মার্চ কমিটি করেছে। এদিকে রমজান ও গরম
যুগপৎ চলে আসায় এ অঞ্চলের গ্রাহকদের দুর্ভোগ বরাবরের মতো শুরু হয়ে গেছে। সেহরি, ইফতার ও তারাবির
নামাজ পড়ার সময় বিদ্যুৎহীন কষ্ট ভোগ নিত্যদিনের । অনেক অঞ্চলে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ যাচ্ছে না। টানা
বিদ্যুৎহীন থেকে দুর্ভোগেই রমজানে রোজা পালনে বাধ্য হচ্ছেন গ্রাহকগণ।
মধুপুর পৌর এলাকার পুন্ডুরা গ্রামের আব্দুল আওয়াল মন্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইফতার ,মাগরিবের
নামাজ,তারাবি ও সেহরির সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ খুব বিরক্ত। পাহাড়ি অঞ্চলের কুড়ালিয়া ইউনিয়নের বানিয়াবাড়ি পুরাতন জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন রফিকুল ইসলাম জানান রমজানের শুর থেকেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে প্রায় প্রতিদিনই সোলার ব্যবহার করে রাতে রোজাদার ডাকাডাকি ও আজান দিতে হচ্ছে। তারা বলেন, দফায় দফায় দাম বাড়ার গ্যাড়াকলে পাবলিক।
অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে শুনি, পাবলিক পায় না। সেটা যায় কোথায়?
কদিমহাতীল (চাপড়ীবাজারের) ব্যবসায়ী শেখ সোহরাব আলী জানান, রোজার আগে কিছুটা হলেও বিদ্যুৎ
পেতাম কিন্তু রোজা আসার সাথে সাথেই তার চিত্র পাল্টে গেছে।
মহিষমারার শালিকা গ্রামের দেলোয়ার হোসেন জানান, গত সেহরিতে ভাত রান্না করতে দিয়ে বিদ্যুতের জন্য
অপেক্ষা করে আর বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ভাত রান্না হয় নাই । মুড়ি ও কলা খেয়ে রোজা রাখতে হয়েছে।
শোলাকুড়ির মোশারফ নামের একজন জানান, টানা দুই তিন দিন বিদ্যুৎ থাকে না। খুব কষ্টে আছি। জনৈক
নুর আলম বলেন, এই রমজান মাসে তাও আবার শিডিউল ম্যাইনটেন করে অর্থাৎ সেহরির সময়, ইফতারের সময় আর
তারাবির সময়ই লোড শেডিং বেশি হচ্ছে।
এদিকে যোগাযোগ করা হলে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি- ১ সূত্র জানায়, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ
কম থাকার কারণে এমন অবস্থা। টাঙ্গাইলের ৫ উপজেলায় জামালপুর ও টাঙ্গাইল পৃথক দুই গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ
সরবরাহ হয়। টাঙ্গাইল গ্রিডের আওতায় ঘাটাইল ও ভুঞাপুর এবং জামালপুর গ্রিডের আওতায় মধুপুর, ধনবাড়ী ও
গোপালপুর উপজেলা। অব পিক আওয়ারে ১৭ মেঘাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে টাঙ্গাইল গ্রিড থেকে পাওয়া যায়
গড়ে ১০ মেঘাওয়াট। জামালপুর গ্রিড থেকে অব পিকে ৪৮ মে.ওয়াট চাহিদার বিপরীতে গড়ে পাওয়া যাচ্ছে ২৪
মে.ওয়াট। পিক আওয়ারেও চিত্র এমন। টাঙ্গাইল গ্রিডে ১৯ এর বিপরীতে সরবরাহ ১৩ এবং জামালপুর গ্রিডে ৫৪
এর বিপরীতে ২৮। আর মধুপুর জোনাল অফিসের আওতায় ৯৭ হাজার ৫০০ গ্রাহকের ২১ মে. ওয়াট জাহিদার
বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১১ মে.ওয়াট। সাব স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ভিত্তিতে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ
পাওয়া যেতে পাওে সূত্রটি জানিয়েছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার মো. শহিদ উদ্দিন জানান, সাব স্টেশনের পাশেই
নিজস্ব অর্থায়নে সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ভোল্টেজ কনভার্ট করতে সুইচিং স্টেশন করার মাধ্যমে পল্লী
বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে প্রস্তুতি নিয়েছে। সরবরাহ জটিলতা ও চলমান গ্রিডের সরবরাহ প্রত্যাহারের বিষয়ে
নিশ্চয়তার দোলাচালে দীর্ঘ সূত্রিতা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেছেন। তিনি জানান, সর্বশেষ গত ৬ মার্চ
পিজিসিবি ময়মনসিংহের প্রধান প্রকৌশলীকে প্রধান করে তিন সদস্যের এক কমিটিতে পল্লী বিদ্যুতের
ডিজিএম টেকনিক্যালকে রাখা হয়েছে। এ কমিটির মতামতের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হবে। তিনি জানান তবে খুব শিগগির এ কমিটির সভা বসবে এবং সমস্য সমাধান বিষয়ে মতবিনিময় হবে।