মোহাম্মদ করিম, লামা–আলীকদম প্রতিনিধি
বান্দরবানের লামা পৌরসভা। একসময় তীব্র আর্থিক সংকট, কোটি টাকার দেনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসের পর মাস বকেয়া বেতন-ভাতার চাপে বিপর্যস্ত ছিল পৌরসভার স্বাভাবিক কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের জমে থাকা আর্থিক দায়দেনা ও অনিয়মিত রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রতিষ্ঠানটি এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথে। সরকারি তহবিলের বকেয়া পরিশোধ, বিদ্যুৎ বিলের দায় কমানো, নিয়মিত বেতন প্রদান এবং রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতির মধ্য দিয়ে পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে। এ পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন।
বকেয়া পরিশোধে স্বস্তি
পৌর প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মো. মঈন উদ্দিন আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দায় পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছে।
গত ১৬ বছর ধরে আটকে থাকা সরকারি জিপিএফ (GPF) ও সিপিএফ (CPF) তহবিলের ২৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি পৌরসভার নামে জমে থাকা ১২ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বিদ্যুতের অপচয় রোধে অপ্রয়োজনীয় ১৮টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (বিএমডিএফ) ঋণের ৯ লাখ টাকা এবং জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত বকেয়া ফি বাবদ ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে পৌর প্রশাসন।
দীর্ঘদিনের আর্থিক দায় পরিশোধের এ উদ্যোগ পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
একসময় লামা পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন-ভাতা বকেয়া থাকত। এতে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতো এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়তে হতো। বর্তমানে পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বকেয়া নেই।
এ ছাড়া পৌরসভার প্রয়াত এক কর্মকর্তার পরিবারের প্রাপ্য বকেয়া অর্থের মধ্যে ৯ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইল অনুমোদন করা হয়েছে। প্রশাসনের এ উদ্যোগকে মানবিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পৌরসভার কর নির্ধারক নুর মোহাম্মদ বলেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধের মাধ্যমে একটি ঋণগ্রস্ত পৌরসভাকে সচল ও স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
পৌরসভার দারোয়ান রাজিব মল্লিক বলেন, আগে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকত। এখন নিয়মিত বেতন পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে।
পৌরসভার আর্থিক পুনরুদ্ধারে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পৌর প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ৫৮ লাখ ২১ হাজার ৮০৪ টাকা, ট্রেড লাইসেন্স বাবদ ১০ লাখ টাকা এবং নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র, জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন ও ওয়ারিশ সনদ বাবদ চার লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। দোকানভাড়া বাবদ আদায় হয়েছে সাত লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে ৩৯ লাখ টাকায়। ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ১৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ খাতে আদায়ের পরিমাণ ১৬ লাখ টাকা বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত কর আদায়, বকেয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে পৌরসভার আর্থিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ অগ্রগতির স্থায়িত্ব নির্ভর করবে রাজস্ব আদায়ের ধারাবাহিকতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার ওপর।
অবকাঠামো ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা
আর্থিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অবকাঠামোগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিনের উদ্যোগে পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক বিলছড়ি সিলেটি পাড়া জামে মসজিদের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান পাড়া এলাকার পানির ট্যাংকি মসজিদের ছাদ মেরামতে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এ ধরনের উদ্যোগ পৌরসভার সেবামূলক কার্যক্রমকে আরও জনমুখী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
নিজের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “সরকার আমাকে জনগণের সেবা করার লক্ষ্যেই পাঠিয়েছে। আমি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেছি। লামা পৌরসভার এ দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং সচেতন নাগরিকদের নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের মাধ্যমে।”
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. মঈন উদ্দিন। দায়িত্ব গ্রহণের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর প্রশাসক, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসক, সহকারী কমিশনার (ভূমি), রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তা ও নির্বাহী আদালতের বিচারক, এমন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একযোগে পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
লামা পৌরসভার সাম্প্রতিক আর্থিক অগ্রগতি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে এ অগ্রগতিকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে নিয়মিত রাজস্ব আদায়, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, দেনা পরিশোধের ধারাবাহিকতা এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। ঋণমুক্ত ও জনবান্ধব পৌরসভা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।