বিশেষ প্রতিনিধি: মো. জহির খান
আবারও রক্তে রঞ্জিত হলো দেশের অন্যতম ব্যস্ততম ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। গভীর রাতে সংঘবদ্ধ ডাকাতদের নৃশংস হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক ট্রাকচালক। চলন্ত ট্রাকের জানালার গ্লাস ভেঙে ধারালো অস্ত্র দিয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে চালককে গুরুতর জখম করা হয়। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও তিনি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে কিছুদূর গাড়ি চালিয়ে যান। পরে ফেনীর মহিপাল এলাকায় পৌঁছালে গাড়ির ভেতরেই তার মৃত্যু হয়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, পাশাপাশি মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ১৪ জুলাই ২০২৬ (মঙ্গলবার) দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর থানাধীন উজানিশার ব্রিজ এলাকায় ভয়াবহ এ ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
নিহত ট্রাকচালক মো. জামাল উদ্দিন (৫৬) ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার উত্তর চর আইসা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত মুনাফ ব্যাপারীর ছেলে। ঘটনার সময় তিনি চট্ট মেট্রো-ঢ-৮১-২৭৪৩ নম্বরের একটি লং ভেহিকেল চালিয়ে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ৫ থেকে ৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল চলন্ত ট্রাকটির ডান পাশের গ্লাস ভেঙে ফেলে এবং মুহূর্তের মধ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে চালক জামাল উদ্দিনের ঘাড়ে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। আকস্মিক এ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হলেও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারাননি। বরং নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেই কিছুদূর পর্যন্ত ট্রাকটি চালিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুর্বল হয়ে পড়লে তিনি গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হেলপার মো. বিল্লাল (২৩)-এর হাতে তুলে দেন। বিল্লাল ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব কাঁঠালী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দ্রুত ট্রাকটি চালিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফেনীর মহিপাল এলাকায় পৌঁছানোর আগেই গুরুতর আহত জামাল উদ্দিন গাড়ির ভেতরেই মৃত্যুবরণ করেন।
এরপর বিল্লাল ট্রাকটি চালিয়ে সকাল আনুমানিক ৭টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানাধীন নাহার এগ্রো ফিড লিমিটেডের বিপরীতে ফারদিন পেট্রোল পাম্পের সামনে নিয়ে আসেন এবং বিষয়টি মজুমদার ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
সংবাদ পেয়ে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হেলপার বিল্লালকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার বিস্তারিত জানা যায়। পরে পুলিশ নিহতের মরদেহের সুরতহালসহ প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম শুরু করে এবং বিষয়টি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর থানাকে অবহিত করে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারকেও খবর দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় মহাসড়কে চলাচলকারী পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, মহাসড়কে রাতের বেলায় টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে এবং জড়িত ডাকাতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
মহাসড়কে একের পর এক ডাকাতি ও প্রাণহানির ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের অপরাধ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।