জুবাইয়া বিন্তে কবির
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি যেমন অপার সম্ভাবনার, তেমনি নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার বিশাল বদ্বীপে গড়ে ওঠা এই দেশটি একদিকে উর্বর ভূমির আশীর্বাদ পেয়েছে, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, বজ্রপাত, কালবৈশাখী, নদীভাঙন ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিয়তি হিসেবে বহন করে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সেই ঝুঁকি আজ আরও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের জীবন রক্ষার অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। একটি নির্ভুল পূর্বাভাস কখনো কখনো হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। কয়েক ঘণ্টা আগেই যদি উপকূলের মানুষ জানতে পারেন যে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে যাচ্ছে, তবে তারা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারবেন, জেলেরা নিরাপদে ফিরতে পারবেন, কৃষক ফসল রক্ষা করতে পারবেন এবং প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবে। অর্থাৎ একটি আধুনিক আবহাওয়া ব্যবস্থা কেবল তথ্য দেয় না, জীবন বাঁচায়।
কার্যত পঙ্গু আবহাওয়া অধিদপ্তর : দুঃখজনক হলেও সত্য, দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এখনও বহু ক্ষেত্রে কয়েক দশক আগের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ ডপলার রাডার অচল, বজ্রপাত শনাক্তকারী সেন্সরের বড় অংশ বিকল, নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ নেই, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার নেই, এমনকি পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত আবহাওয়াবিদ ও প্রকৌশলীও নেই।
ফলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে বিদেশি সংস্থার তথ্য এবং সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করেই পূর্বাভাস দিতে হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; এটি রাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি বড় ঝুঁকি।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পুরোনো প্রযুক্তি আর যথেষ্ট নয় :
বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘ খরা এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়েছে। আগে যে আবহাওয়ার ধরণ কয়েক দিনে পরিবর্তিত হতো, এখন তা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় পুরোনো অ্যানালগ প্রযুক্তি দিয়ে আধুনিক দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার, রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট তথ্য, উন্নত ডপলার রাডার এবং স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার।
উন্নত বিশ্বের শিক্ষা: প্রযুক্তিতেই নিরাপত্তা : বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই উপলব্ধি করেছে যে আবহাওয়া পূর্বাভাসে বিনিয়োগ মানে মানুষের জীবন ও অর্থনীতি রক্ষায় বিনিয়োগ। জাপান পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তবুও সেখানে শক্তিশালী আবহাওয়া সংস্থা, নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ, শতাধিক আধুনিক ডপলার রাডার, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার কারণে ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প-পরবর্তী সুনামি কিংবা ভারী বৃষ্টিপাতের আগাম সতর্কতা অত্যন্ত দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের National Weather Service এবং NOAA বিশ্বের অন্যতম উন্নত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পরিচালনা করে। শত শত রাডার, একাধিক আবহাওয়া উপগ্রহ, সমুদ্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে তারা কয়েক দিন আগেই সম্ভাব্য ঝড়ের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। ফলে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্তের :
বাংলাদেশ প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বজ্রপাত ও নদীভাঙনে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখোমুখি হয়। কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—প্রতিটি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ আধুনিক আবহাওয়া প্রযুক্তিতে তুলনামূলক সীমিত বিনিয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষতির বড় অংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
সুতরাং আবহাওয়া অধিদপ্তরকে একটি সাধারণ সরকারি দপ্তর হিসেবে নয়; বরং জাতীয় দুর্যোগ নিরাপত্তার অন্যতম কৌশলগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। কারণ একটি নির্ভুল পূর্বাভাস শুধু আবহাওয়ার খবর নয়—এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম রক্ষাকবচ।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের অভিজ্ঞতা: প্রযুক্তিই দুর্যোগ মোকাবিলার মূল শক্তি : দুর্যোগ মোকাবিলায় জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্র। কারণ দেশটি কখনো দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানোর দাবি করেনি; বরং প্রযুক্তি, গবেষণা এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। জাপান আবহাওয়া সংস্থা (JMA) নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার, শতাধিক ডপলার রাডার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে সারা দেশে সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম। মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাইরেন—সব মাধ্যম একযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য উন্নত দেশও একই পথ অনুসরণ করেছে। সেখানে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুধু একটি সরকারি দপ্তরের কাজ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে তারা প্রতিবছর বিপুল বিনিয়োগ করে। কারণ তারা জানে, দুর্যোগের আগে সতর্কতা দেওয়া দুর্যোগের পরে পুনর্গঠনের চেয়ে অনেক কম ব্যয়বহুল এবং বহুগুণ কার্যকর।
আধুনিক স্যাটেলাইট, ডপলার রাডার ও সুপারকম্পিউটার কেন অপরিহার্য : বর্তমান বিশ্বের আবহাওয়া পূর্বাভাস মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—আবহাওয়া উপগ্রহ, ডপলার রাডার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার।
স্যাটেলাইট মহাকাশ থেকে মেঘের সৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে। ডপলার রাডার স্থানীয়ভাবে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও বাতাসের বেগ নির্ণয় করে। অন্যদিকে সুপারকম্পিউটার প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য আবহাওয়ার মডেল তৈরি করে। বাংলাদেশে এই তিনটি ব্যবস্থার কোনোটিই আন্তর্জাতিক মানে গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেক সময় পূর্বাভাস দিতে বিলম্ব হয়, আবার কোথাও কোথাও পূর্বাভাসের নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এমন সীমাবদ্ধতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
দক্ষ জনবল ছাড়া প্রযুক্তিও অকার্যকর : শুধু উন্নত যন্ত্রপাতি কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ আবহাওয়াবিদ, প্রকৌশলী, তথ্যবিশ্লেষক, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকও প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের অনেক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সীমিত জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও একজন, কোথাও দুজন কর্মকর্তা পুরো দায়িত্ব পালন করছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আবহাওয়াবিজ্ঞান ও জলবায়ুবিষয়ক উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ জরুরি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশকেও একই পথ অনুসরণ করতে হবে। কারণ দক্ষ মানুষই প্রযুক্তিকে কার্যকর করে তোলে।
কৃষি, মৎস্য, বিমান ও নৌপরিবহনের নিরাপত্তায় আবহাওয়া তথ্যের গুরুত্ব : বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষকের বীজ বপন, সেচ, সার প্রয়োগ কিংবা ফসল কাটার সময় নির্ধারণে নির্ভুল আবহাওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বঙ্গোপসাগরে হাজার হাজার জেলে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে যান। সামান্য বিলম্বে দেওয়া সতর্কবার্তাও শত শত প্রাণহানির কারণ হতে পারে। বিমান চলাচল, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নির্মাণশিল্প, পর্যটন এমনকি নগর ব্যবস্থাপনাও এখন আবহাওয়া তথ্যনির্ভর। উন্নত বিশ্বে কৃষকদের জন্য আলাদা কৃষি আবহাওয়া সেবা, মৎস্যজীবীদের জন্য সমুদ্র পূর্বাভাস এবং বিমান চলাচলের জন্য বিশেষায়িত আবহাওয়া তথ্য সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশেও এই সেবাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সময়ের দাবি।
বিনিয়োগ নয়, এটি জীবন ও অর্থনীতি রক্ষার বীমা :
অনেকে মনে করেন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা বা দীর্ঘস্থায়ী অতিবৃষ্টি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো, কৃষি, শিল্প ও জনসম্পদের ক্ষতি করতে পারে।
অন্যদিকে আধুনিক রাডার, উন্নত স্যাটেলাইট তথ্যপ্রযুক্তি, বজ্রপাত শনাক্তকরণ নেটওয়ার্ক, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা দীর্ঘমেয়াদে বহু গুণ বেশি অর্থ সাশ্রয় করবে। তাই এটিকে ব্যয় হিসেবে নয়; বরং মানুষের জীবন, জাতীয় অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের করণীয় : জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিদিনের বাস্তবতা। বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার আমাদের উন্নয়নের ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই বাস্তবতায় আবহাওয়া অধিদপ্তরকে কেবল একটি পূর্বাভাস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে জলবায়ু গবেষণা, দুর্যোগ ঝুঁকি বিশ্লেষণ, কৃষি পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা, নগর উন্নয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সমন্বিত একটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছে; বাংলাদেশকেও সেই পথে এগোতে হবে।
একটি আধুনিক আবহাওয়া অধিদপ্তর গঠনে যেসব পদক্ষেপ জরুরি : বাংলাদেশের আবহাওয়া ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রথমত, দেশের সব ডপলার রাডার দ্রুত সচল করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে আধুনিক এস-ব্যান্ড ও সি-ব্যান্ড রাডার স্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বজ্রপাত শনাক্তকারী সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সারা দেশে সম্প্রসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের সুপারকম্পিউটার স্থাপন করে নিজস্ব আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, উন্নত ডেটা সেন্টার, ক্লাউডভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আবহাওয়া গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পূর্বাভাসের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন ও দক্ষ মানবসম্পদই সফলতার চাবিকাঠি : প্রযুক্তি কেনা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু প্রযুক্তিকে কার্যকর রাখা কঠিন। বহু উন্নয়ন প্রকল্পে আমরা দেখেছি, কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং সময়মতো সংস্কারের অভাবে সেগুলো অচল হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ক্ষেত্রেও সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।
এ জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ প্রকৌশলী ও আবহাওয়াবিদ নিয়োগ, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, কৃষি, নৌপরিবহন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সরকার—সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একটি সমন্বিত জাতীয় দায়িত্ব।
আবহাওয়ায় বিনিয়োগ মানেই উন্নয়নে বিনিয়োগ : বাংলাদেশ আগামী দিনের উন্নত, স্মার্ট ও জলবায়ু-সহনশীল রাষ্ট্র হতে চাইলে আবহাওয়া প্রযুক্তিকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ নৌপরিবহন, বিমান চলাচল, শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন এবং উপকূলীয় অর্থনীতির বিকাশ—সব ক্ষেত্রেই নির্ভুল আবহাওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর একটি বড় ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি করে, সেই তুলনায় আধুনিক আবহাওয়া প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ব্যয় অনেক কম। তাই এটি কোনো বিলাসী প্রকল্প নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কৃষি, শিল্প এবং মানুষের জীবন রক্ষার অন্যতম লাভজনক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
পরিশেষে, একটি রাষ্ট্রের দূরদর্শিতা বোঝা যায়, সে কত দ্রুত দুর্যোগের খবর পায় এবং কত দক্ষতার সঙ্গে জনগণকে নিরাপদ রাখতে পারে। বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হলেও আধুনিক আবহাওয়া প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এখনও অনেক দূর এগোতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে ঘূর্ণিঝড়ের আগেই প্রতিটি উপকূলবাসীর মোবাইল ফোনে নির্ভুল সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে; কৃষক বৃষ্টির সঠিক সময় জেনে ফসল রক্ষা করবেন; জেলে নিরাপদে সমুদ্রযাত্রা করবেন; বজ্রপাতের আগেই মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন; এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র তার প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। মনে রাখতে হবে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস কেবল একটি সংবাদ নয়—এটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকার। একটি সচল ডপলার রাডার, একটি কার্যকর স্যাটেলাইট, একটি শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার কিংবা একজন দক্ষ আবহাওয়াবিদের মূল্য কেবল অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের জীবন, জীবিকা, নিরাপত্তা এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই অস্থির সময়ে তাই আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরকে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতেই হবে। কারণ একটি নির্ভুল পূর্বাভাস শুধু দুর্যোগের খবর দেয় না—এটি জীবন বাঁচায়, অর্থনীতি রক্ষা করে এবং ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করে তোলে। বাংলাদেশের আগামী দিনের নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থেই এখন সময় এসেছে—পঙ্গু নয়, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও বিশ্বমানের একটি আবহাওয়া অধিদপ্তর গড়ে তোলার।
আমার পরামর্শ হবে, প্রকাশের আগে এতে সর্বশেষ সরকারি তথ্য (রাডারের বর্তমান সংখ্যা, সচল অবস্থার হালনাগাদ তথ্য, বাজেট ও সাম্প্রতিক প্রকল্প) যাচাই করে যুক্ত করলে নিবন্ধটি আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট