মো. শাহীন আলম গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
নদ-নদী বেষ্টিত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। বর্ষা এলেই তিস্তা ও আশপাশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পায়, আর সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে নদীতীরবর্তী মানুষের উদ্বেগ। কখন ঘরবাড়ি তলিয়ে যাবে, কখন ফসল হারাতে হবে কিংবা কখন পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে হবে—এমন অনিশ্চয়তা নিয়েই তাদের প্রতিটি বর্ষা কাটে। তাই দুর্যোগের আগেই জনসচেতনতা ও প্রস্তুতি জোরদার করতে আয়োজন করা হয়েছে বন্যা মোকাবিলার একটি বাস্তবধর্মী মহড়া।
‘দুর্যোগ প্রস্তুতিতে লড়ব, তারুণ্যের বাংলাদেশ গড়ব’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বুধবার (৮ জুলাই) গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের বালুরচর-ছাটগ্রাম এলাকায় তিস্তা নদীর তীরে দিনব্যাপী এ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়।
চণ্ডীপুর ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির আয়োজনে, জেড জুরিখ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের সহযোগিতায় গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) বাস্তবায়িত ‘জুরিখ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’-এর আওতায় মহড়াটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যালায়েন্স সহযোগিতা প্রদান করে।
মহড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ শতাধিক নারী-পুরুষ অংশ নেন। পুরো আয়োজনটি বাস্তব বন্যা পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। কোথাও ভেলায় করে ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, কোথাও আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান, আবার কোথাও নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্ধার ও স্থানান্তরের অনুশীলন করা হয়।
এ ছাড়া বন্যার আগাম সতর্কতা প্রচার, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে গমন, বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার সংরক্ষণ, গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর বিভিন্ন কৌশলও প্রদর্শন করা হয়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে মহড়াটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
মহড়ায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ইফফাত জাহান তুলি।
চণ্ডীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মেহেদী মোস্তফা মাসুমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শারিকুল ইসলাম, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোজাম্মেল হক, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাধব আলী, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. কামরুল ইসলাম, কঞ্চিবাড়ী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. সেলিম রেজা, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক সুদীপ্ত শামীম, ইউপি সদস্য রঞ্জু মিয়া এবং পিপল ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের জুরিখ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়কারী জয়া প্রসাদ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জুরিখ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম।
বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তাই শুধু ত্রাণনির্ভর না হয়ে আগাম প্রস্তুতি, স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। দুর্যোগের সময় সচেতনতা ও প্রস্তুতিই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তারা আরও বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ যত বাড়বে, ক্ষয়ক্ষতি তত কমানো সম্ভব হবে। পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতেও ইউনিয়ন পর্যায়ে এ ধরনের ব্যবহারিক মহড়া ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে, যাতে দুর্যোগের সময় প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের পাশাপাশি অন্যের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।