মোঃ আসিফুজ্জামান আসিফ আসিফ,নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার সাভারে আলোচিত দুটি মামলার প্রধান আসামি, বহিষ্কৃত সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামিরকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দীর্ঘ ৯ দিন আত্মগোপনে থাকার পর বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর সদরঘাট জংশন রোড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইদুল ইসলাম।
গ্রেপ্তার মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামির সাভার সদর ইউনিয়নের দেওগাঁও এলাকার মৃত মতিউর রহমানের ছেলে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং পরিচালনা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ নানা অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। সম্প্রতি সাভারে সংঘটিত দুটি আলোচিত মামলার প্রধান আসামি হিসেবে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
ঢাকা জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ জুন সাভার মডেল থানায় লাবনী বেগম নামে এক নারী লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে বলা হয়, তার খালাতো ভাই শামীম রেজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ থেকে মাদক ব্যবসায়ী ভাইয়ের জামিনের কথা বলে দীর্ঘদিন ধরে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন মাহাবুব হোসেন সামির। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এ পর্যন্ত ৬ দফায় তার নেতৃত্বে সশস্ত্র সহযোগীরা হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধরের ঘটনা ঘটায়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ মে রাজাশন আমতলায় শামীম রেজার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, নগদ ৪ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ টাকা লুট এবং গ্যারেজ থেকে ১২টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যায় হামলাকারীরা। একই সময় গ্যারেজের ক্যাশবক্স থেকে আরও ৯০ হাজার টাকা লুট করা হয়। পরবর্তীতে ২৭ মে পুনরায় গ্যারেজে হামলা চালিয়ে আরও ছয়টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ১২ জুন সকালে আরও পাঁচটি অটোরিকশা, ১৬ জুন ১৪ লাখ টাকার ব্যাটারি ও ৬ লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেল জোরপূর্বক নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
১২ জুন রাতে শামীম রেজার বাসায় ঢুকে তার পরিবারের সদস্যদের মারধর, নারীকে লাঞ্ছিত করা, শিশুকে আছাড় দেওয়া, স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করে মাহাবুব ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরবর্তীতে ওই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে সাভার মডেল থানায় মাহাবুব হোসেন সামিরসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট, হামলা, নারী লাঞ্ছনা ও হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের হয়।
এদিকে, শামীম রেজার গ্যারেজ থেকে অর্ধকোটি টাকারও বেশি মূল্যের ২৩টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা লুটের ঘটনার পরপরই আরও একটি ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে ফেন্সি সামির। অভিযোগ রয়েছে, গত ২ জুন রিপন ঋষি নামে এক সনাতন ধর্মাবলম্বী কিশোরকে অপহরণ করে পাশবিক নির্যাতন চালায় মাহাবুব হোসেন সামির ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের হয়।
দুটি মামলাই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একদিকে কিশোর নির্যাতন, অন্যদিকে ধারাবাহিক লুটপাট, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে সদ্য গঠিত সাভার থানা ছাত্রদলের কমিটি। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মাহাবুব হোসেন সামিরকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দেয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাকে নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। আলোচিত রুবেল হত্যা মামলা, বাড়ির আশপাশের পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসিয়ে মাদক ব্যবসাসহ একাধিক অভিযোগ থাকার পরও কীভাবে তিনি ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পান, তা নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। এছাড়াও জুলাই আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে তার সম্পৃক্ততার বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে ৫ আগস্টের পর নিজেকে 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
এছাড়া তার আপন ভাই যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত হৃদয় হোসেন ওরফে ফর্মা হৃদয় প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাও সে সময় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। এরপরও মাহাবুব হোসেন সামির ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।
এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম খান প্রতিবেদককে বলেন, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপারের সার্বিক নির্দেশনায় আলোচিত এই দুই মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারে সাভার মডেল থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে মাহাবুব হোসেন সামিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া অটোরিকশা, ব্যাটারি ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই আইনের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ও চলতি দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, দুই মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় তদন্ত আরও এগিয়ে যাবে। আদালতের মাধ্যমে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হবে। একই সঙ্গে মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা জেলা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মাহাবুব হোসেন সামিরকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুটি মামলার তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ এবং পলাতক সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।