শেখ সাদী সুমন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি
দীর্ঘ সাত মাস ধরে নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পরিচয় মিলল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত মানসিক ভারসাম্যহীন সেই ব্যক্তির। তাঁর নাম মাসুদ রানা (৪৭)। তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার পাটাভোগ ইউনিয়নের মাশুরগাঁও গ্রামের এস এম ফারুক আহমেদের একমাত্র ছেলে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ইউনিট ও স্থানীয় মানবিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর যৌথ প্রচেষ্টায় জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাত ৮টার দিকে মরদেহটি তাঁর বৃদ্ধ পিতা ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে সদর মডেল থানা পুলিশ।
মেধার অপমৃত্যু ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মাসুদ রানা ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পর শ্রীনগর হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকার একটি কলেজে ভর্তি হলেও পারিবারিক ও মানসিক অস্থিরতার কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী সোনিয়া ও একমাত্র কন্যা মাইশাকে (১৪) নিয়ে তাঁর সংসার ছিল।
তবে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে স্ত্রী সোনিয়া তাঁকে ছেড়ে ফরিদপুর জেলার এক ভ্যানচালককে বিয়ে করে চলে যান। স্ত্রীর চলে যাওয়া এবং ১২ বছরের সংসার ভেঙে যাওয়ার এই নির্মম আঘাত মেনে নিতে পারেননি মাসুদ রানা। তীব্র মানসিক ভারসাম্যহীনতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি একপর্যায়ে সম্পূর্ণ লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। স্বজনরা সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান না পেয়ে ২০ ডিসেম্বর শ্রীনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
খরমপুর থেকে হাসপাতাল: এক নির্মম জীবনাবসান
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার পর মাসুদ রানা ভবঘুরের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় কাটাতেন। প্রায় দুই মাস তিনি আখাউড়া বাইপাস সড়কের খরমপুর ব্রিজ এলাকায় অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে ছিলেন। অবহেলা আর অনাহারে তাঁর দুই হাতের চামড়া উঠে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল।
গত ১৮ মে স্থানীয় কয়েকজন তরুণের সহযোগিতায় ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ তাঁকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হলেও পরদিন ভোররাতে তিনি হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হন। এরপর ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই শহরের শিমরাইলকান্দি ও বিজয়নগরের মনিপুর এলাকায় তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন।
শেষ পরিণতি ও দাফন
গত বুধবার (৩ জুন) সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের ঘাটুরা এলাকায় কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশ থেকে তাঁর অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় এবং ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর তত্ত্বাবধানে ফ্রিজিং করে রাখা হয়। পরবর্তীতে পিবিআই প্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর আঙুলের ছাপ ও এনআইডি কার্ডের তথ্য মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবারকে অবগত করে।
মৃত্যুর পর ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর পক্ষ থেকে কাফনের কাপড় ও ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়। গতকাল শুক্রবার (৫观测) ভোররাত ৪টায় মরদেহ মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে পৌঁছায় এবং সকাল ৯টায় জানাজা শেষে স্থানীয় যৌথ কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
মাসুদ রানার এই আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আজহার উদ্দিন মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।