মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম চট্টগ্রাম বাঁশখালী প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম জেলার প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ এর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা পদক কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা স্বাক্ষরিত তালিকায় এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
ঘোষিত ফলাফলে চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (পুরুষ) হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাঁশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। একইসঙ্গে শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে বাঁশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর আগে উপজেলা পর্যায়েও একই দুটি ক্যাটাগরিতে বিদ্যালয় ও প্রধান শিক্ষক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান, দক্ষ নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা ও উপজেলা—উভয় পর্যায়ে এই বিরল সম্মান অর্জন করলেন মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন বাঁশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
জানা যায়, ২০০৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি প্রথমে ছনুয়া খুদুকখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ছনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং জলদী ভাদালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সফলতার সঙ্গে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে তিনি বাঁশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং অদ্যাবধি সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করে। পাশাপাশি প্রতিবছর ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ গ্রেডে সর্বোচ্চ সংখ্যক বৃত্তি অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় বিশেষ সুনাম লাভ করে।
২০২২ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের ২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ জন ট্যালেন্টপুল এবং ৩ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করে। এছাড়া ২০১৬ সালে ২৮ জন ট্যালেন্টপুল ও ৬ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করে শিক্ষার্থীরা।
শুধু একাডেমিক ক্ষেত্রেই নয়, জাতীয় পর্যায়েও বিদ্যালয়টির সাফল্য ঈর্ষণীয়। জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড মূল্যায়নে ২০১৯ ও ২০২২ সালে বিদ্যালয়টি সারাদেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পৌরসভা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত একাধিক পুরস্কার লাভ করে শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তাঁর উদ্যোগে দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে বেদখল থাকা বিদ্যালয়ের ২২ শতক জমি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া নতুন ভবন নির্মাণ, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ স্থাপন, সিসিটিভি ক্যামেরা সংযোজন, ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠদান, লাইব্রেরি ও উপকরণ কক্ষ স্থাপন, অনলাইন ভর্তি ব্যবস্থা চালু এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে বিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছে ‘সততা স্টোর’ ও ‘মানবতার দেয়াল’। পাশাপাশি নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৭৭৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হারও শূন্য শতাংশ বলে জানা গেছে।
শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ায় অনুভূতি প্রকাশ করে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, “এই অর্জন শুধু আমার একার নয়। এটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। আধুনিক, নৈতিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমি ভবিষ্যতেও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাব। শিক্ষা ক্ষেত্রে কখনো ছলচাতুরী বা প্রতারণার স্থান নেই; যোগ্যতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রকৃত স্বীকৃতি অর্জিত হয়।”
এদিকে তাঁর এই সাফল্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় সচেতন মহল আনন্দ প্রকাশ করে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
বাঁশখালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হামিদ বলেন, “মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ একজন দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল প্রধান শিক্ষক। তাঁর নেতৃত্বে বাঁশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু বাঁশখালী নয়, সমগ্র চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলের একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ কারণেই তিনি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন