শাহীন আলম গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিকাপাসিয়া খেয়াঘাট জোরপূর্বক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এ সময় বৈধ ইজারাদারের মাঝিকে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ থানায় লিখিত এজাহার দিয়েছেন ভুক্তভোগী ইজারাদার ও কাপাসিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. হারুন-অর-রশিদ।
অভিযুক্ত জামাল উদ্দিন কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিকাপাসিয়া গ্রামের মো. ওসমান গনীর ছেলে।
শুক্রবার (২২ মে) সকালে সমর্থকদের নিয়ে ভাটিকাপাসিয়া খেয়াঘাটে হাজির হন জামাল উদ্দিন। এরপর জোরপূর্বক ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের লোকজন দিয়ে পারাপার কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, এটি জামাল উদ্দিনের প্রথম ঘাট দখলের ঘটনা নয়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে ১৪৩১ বঙ্গাব্দের অবশিষ্ট সময়ের জন্যও তিনি এই ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। পরে ১৪৩২ বঙ্গাব্দে পাঁচজনের সমন্বয়ে পরিচালিত খাস কালেকশনেও তিনি অংশীদার ছিলেন।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রজবখালী লটঘাট, মাটিয়াল ফারি ঘাট, চণ্ডিপুর, লালচামার ফারি, কাপাসিয়া-ভাটিকাপাসিয়া, উজান বুড়াইল-ভাটি বুড়াইল ও পোড়ারচর ঘাট নিয়ে গঠিত ৩ নম্বর প্যাকেজের আওতায় খেয়াঘাটগুলো ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ইজারা দেওয়া হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে লালচামার গ্রামের রিয়াজুল হকের ছেলে মো. হারুন-অর-রশিদ ইজারা লাভ করেন। জেলা পরিষদের সঙ্গে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে তাঁর লোকজন ঘাট পরিচালনা করে আসছিলেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঘাট দখলের আগে থেকেই জামাল উদ্দিন ইজারাদার হারুন-অর-রশিদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দিলে ঘাট দখলের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে লাঠি, ছোরা ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক ঘাটে প্রবেশ করে। এ সময় ইজারাদারের নৌকায় কর্মরত মাঝি মো. কবির উদ্দিনকে নৌকা থেকে টেনে নামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জামাল উদ্দিন নিজে লোহার রড দিয়ে কবির উদ্দিনের ডান পায়ের হাঁটুর নিচে আঘাত করলে তাঁর পা ভেঙে যায়। পরে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, হামলার পরও অভিযুক্তরা ঘাট ছেড়ে না গিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না পাওয়া পর্যন্ত ঘাট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ইজারাদার ও তাঁর লোকজনকে প্রাণনাশ এবং লাশ গুমের হুমকিও দেওয়া হয়।
ইজারাদার সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩১ বঙ্গাব্দে যাত্রীপ্রতি ৪০ টাকা টোল আদায় করা হতো। পরে খাস কালেকশনের সময় স্থানীয়দের সম্মতিতে তা কমিয়ে ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই সময়ের কালেকশন কার্যক্রমে জামাল উদ্দিনও অংশীদার ছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও ৩০ টাকা হারে টোল আদায় করা হচ্ছিল। এ ছাড়া টোল পুনর্নির্ধারণের জন্য জেলা পরিষদে আবেদন করা হয়েছে।
তবে সম্প্রতি অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ তুলে জামাল উদ্দিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এবং ঘাট এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, আগে যে হারে তিনি নিজেও টোল আদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, একই হারে অন্য কেউ টোল আদায় করলে এখন এই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি কোথায়।
এ বিষয়ে কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, 'কাউকে মারধর করিনি, কারও কাছে চাঁদাও দাবি করিনি। তবে স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খেয়াঘাটটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করে টোল আদায় করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ খুশি।'
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি যখন ঘাটের ইজারা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তখনও ৩০ টাকা টোল আদায় করা হতো। তবে আমি তখন থেকেই টোল কমানোর পক্ষে ছিলাম। এর সপক্ষে আমার কাছে প্রমাণও রয়েছে।'
ইজারাদার ও ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, 'বৈধ প্রক্রিয়ায় জেলা পরিষদ থেকে ঘাট ইজারা নিয়েছি। ১৪৩২ বঙ্গাব্দে খাস কালেকশনের সময় সবার সম্মতিতে ৩০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন জামাল উদ্দিন নিজেও সেই কার্যক্রমে ছিলেন। অথচ এখন জোরপূর্বক ঘাট দখল করে আমার মাঝিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।'
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ বলেন, 'হাট-বাজার ও খেয়াঘাট সরকারি সম্পত্তি। সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ইজারা প্রদান করা হয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জোরপূর্বক দখল নেওয়ার এখতিয়ার নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে খেয়াঘাট দখলের যে অভিযোগ উঠেছে, তার সত্যতা পাওয়া গেলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিপুল চন্দ্র দাস বলেন, 'জেলা পরিষদ মালিকানাধীন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর প্যাকেজভুক্ত খেয়াঘাটগুলো বৈধ প্রক্রিয়ায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে হারুন-অর-রশিদ ইজারা পেয়েছেন। তাই ওই ঘাট অন্য কেউ দখল করার কোনো সুযোগ নেই।'
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, '১০ টাকায় পারাপার কেন, ইজারাদার ছাড়া অন্য যে কেউ বিনামূল্যেও পারাপার করাতে চাইলে সেটিও নিয়মবহির্ভূত হবে। জেলা পরিষদের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি খেয়াঘাট পরিচালনা করতে পারবেন না।'
সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, 'এ বিষয়ে শুক্রবার রাতে একটি এজাহার পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।