আমাদের রংপুর সংবাদদাতা জিয়াসমিন আক্তার (ইউসুফ) এর প্রতিবেদনে দেখুন ডেক্সরিপোর্ট:
কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর বিরুদ্ধে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানের করা ক্রিমিনাল মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে কেস ডায়েরি (সিডি) তলব করেছেন আদালত।
একই সাথে দীর্ঘ পাঁচ বছরেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) কে সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
কুড়িগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (সদর আমলি) সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মজনু মিয়া এ আদেশ দেন। আদালতের সাধারণ নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা (জিআরও) আনারুল ইসলাম এবং আরিফুলের আইনজীবী সাইদুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগান তার আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আবেদন দাখিল করেন। পৃথক দুটি আবেদনে মামলার সিডি তলব এবং দীর্ঘ পাঁচ বছরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় আইও’র কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার আরজি জানানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে কোর্ট সাব ইন্সপেক্টর (সিএসআই) শুনানিতে অংশ নিয়ে আদালতকে জানান, কেন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব হচ্ছে তা আদালতকে জানানো প্রয়োজন। আবেদন মঞ্জুর হলে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তি নেই। আদালত শুনানি শেষে দুটি আবেদনই মঞ্জুর করেন।
সংবাদ প্রকাশের জেরে ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করতে চাওয়া এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে শারীরিক নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলামসহ অজ্ঞাত ৩৫/ ৪০ জনের বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম সদর থানায় এজাহার দায়ের করেন সাংবাদিক আরিফ। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ৩১ মার্চ সেই মামলা রেকর্ড করে কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশ। মামলার নম্বর-২৪, জি আর নম্বর-৮৩/২০২০ (কুড়ি)।
সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, পুলিশ প্রবিধানমালা ১৯৪৩ এর ২১ এবং ২৪৫ প্রবিধান এবং সিআরপিসি ১৭৩ ধারা অনুসারে দুটি আবেদন দাখিল করা হয়। আজ (২৭ মার্চ) আবেদনের শুনানি হয়। এতে অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান অংশ নেন। জেলা বারের অন্যান্য আইনজীবীরা এতে সহযোগিতা করেন।
সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়নি। কেস ডায়েরি তলবের ফলে জানা যাবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এই মামলার বিষয়ে কতটুকু তদন্ত করেছেন, কী কী বিষয় তদন্ত করেছেন এবং আর কতদিনের মধ্যে অবশিষ্ট তদন্ত সম্পন্ন করে পুলিশ প্রতিবেদন প্রদান করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ প্রবিধানমালা ১৯৪৩ এর ২৪৫ প্রবিধান এবং সিআরপিসি ১৭৩ ধারা অনুসারে অতিদ্রুত তদন্ত সমাপ্ত করার বিধান থাকা সত্ত্বেও ৫ বছর ধরে তদন্ত সম্পন্ন না করা আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এক ধরণের অপরাধও বটে। এজন্য আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছেন।
শুনানীতে অংশ নেওয়া আরিফুলের আরেক আইনজীবী সাইদুর রহমান সাইদ বলেন, ‘ সিডি তলবের সাথে আদালত আইওকে শোকজ করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করায় আইওর কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছেন। আদালত মনে করেন, এভাবে মামলার প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব করা বিচার প্রার্থীকে হয়রানি করার শামিল এবং ন্যায় বিচার প্রাপ্তির পথে বাঁধা। এজন্য কেন আইওর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হবে না তার লিখিত ব্যাখ্যা সহ আইওকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
জিআরও আনারুল ইসলাম বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সিডি ও লিখিত ব্যাখ্যা সহ আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আমরা আদালতের আদেশ রংপুর পিবিআই কার্যালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
জেলা প্রশাসনের একটি পুকুরের নামকরণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও নানা অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান করায় ২০২০ সালের ১৩ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানের বাসায় হানা দিয়ে তাকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকিসহ ডিসি অফিসে এনে নির্মম নির্যাতন করেন জেলা প্রশাসনের তৎকালীন আরডিসি নাজিম উদ্দিন, এনডিসি রাহাতুল ইসলাম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা। এরপর অধূমপায়ী আরিফকে আধাবোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ এনে ওই রাতেই এক বছরের কারাদন্ড দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। পুরো ঘটনার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। ডিসি সুলতানাকে নিয়ে ‘ কাবিখার টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসির নামে নামকরণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জেরে সাংবাদিক আরিফকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও জেল দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে ১৫ মার্চ আরিফকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। ঘটনার পর তদানীন্তন ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দীন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। একইসঙ্গে এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলা দায়ের হয় এবং ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে ডিসি সুলতানা সহ সকলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। অভিযুক্ত প্রত্যেককে বিভাগীয় শাস্তি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়।
শাস্তি হিসেবে ডিসি সুলতানার ইনক্রিমেন্ট দুই বছরের জন্য স্থগিত করে মন্ত্রণালয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাতুল ইসলামের ইনক্রিমেন্ট তিন বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। আরডিসি নাজিম উদ্দিনকে পদাবনতি দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আর ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমাকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রত্যেকে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ক্ষমা মঞ্জুর হলে পদায়ন ও পদোন্নতি পান অভিযু